Sylhet Today 24 PRINT

আনোয়ারুজ্জামান আশাবাদী, বাবুলের শঙ্কা

সিলেট সিটি নির্বাচন

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২০ জুন, ২০২৩

ফাইল ছবি

বুধবার ১৯০টি কেন্দ্রে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ভোট গ্রহণ হবে। প্রথমবারের মতো এই নগরে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট হতে যাচ্ছে। সিসিকের বর্তমান মেয়র ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী দলের চাপে ‘হ্যাটট্রিক মিশন’ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সিটি নির্বাচনের উত্তেজনায় অনেকখানি ভাটা পড়ে। এক দশক পর নৌকার প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সামনে নগর ভবন আওয়ামী লীগের দখলে আনার সুযোগ আসে।

মেয়র পদে এই সিটিতে আরও সাতজন প্রার্থী থাকলেও জাতীয় পার্টির নজরুল ইসলাম বাবুল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান প্রচারের মাঠে আলোচনায় চলে আসেন। বরিশালে দলের প্রার্থীর ওপর হামলার পর মাহমুদুল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও নজরুল শেষ পর্যন্ত লড়বেন বলে জানিয়েছেন। তবে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় জয় অনেকটাই নিশ্চিত আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থীর। তবে দলীয় বিভেদ কিছুটা অস্বস্তি বাড়াচ্ছে।

তারপরও এই ভোট সুষ্ঠু এবং জয়ী হওয়ার বিষয়ে শুরু থেকেই আশাবাদী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান।

বিপরীতে প্রচার-প্রচারণার শুরু থেকেই আশঙ্কার কথা বলে আসছেন জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল। তার অভিযোগ আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জয়ী করতে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন সবাই একযোগে মাঠে কাজ করছেন।

২০১৮ সালে সর্বশেষ নির্বাচনে মেয়র পদে বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের পরাজয়ের পর সিলেটে দলীয় বিভেদের বিষয়টি সামনে এসেছিল। সাবেক মেয়র (প্রয়াত) কামরানের পরাজয়ের পর দলের স্থানীয় পাঁচ শীর্ষ নেতাকে শোকজ করা হয়। একপর্যায়ে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিও পুনর্গঠন করা হয়। এবার স্থানীয় ১০ নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেও সবাইকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামানকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রাথমিক বিস্ময়, ক্ষোভ, হতাশা দূরে ঠেলে নৌকার হয়ে স্থানীয় সব পর্যায়ের নেতাকর্মী প্রকাশ্যে মাঠে নামেন। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত সব নেতাকেও প্রচারে কমবেশি তৎপরতা চালাতে দেখা গেছে। এরপরও ১০ বছর পর মেয়রের চেয়ার পুনরুদ্ধারের মিশনে আওয়ামী লীগের ভেতরে একধরনের চাপা ‘অস্বস্তি’ রয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ৫ বছর আগের সেই ঘটনার ক্ষত এবারের নির্বাচনের প্রচারের শুরু থেকেই আলোচনায় রয়েছে। গত ৪ মে নগরীর একটি অভিজাত কনভেনশন সেন্টারে মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বিগত নির্বাচনে কামরানের পরাজয়ের জন্য ‘বর্তমান সময়ের মোশতাকদের’ দায়ী করেন। আসন্ন নির্বাচনেও ‘মোশতাকের প্রেতাত্মাদের’ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান নানক। এমনকি প্রথম দিকে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জনও ছিল। শেষ পর্যন্ত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. আব্দুল হানিফ কুটু মেয়র পদে প্রার্থী হলেও প্রকাশ্যে দলের কাউকে দেখা যায়নি। সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সর্বশেষ ভিপি আব্দুল হানিফ নৌকা ও লাঙ্গলের মেয়রপ্রার্থীর পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করলেও প্রচারে নজর কাড়তে ব্যর্থ হন।

তবে আনোয়রুজ্জামান বলছেন, তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘এখানে আমার দল আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ। আমি ১৫ বছর বয়স থেকে দলের রাজনীতিতে যুক্ত। অতীতে এখানে আওয়ামী লীগকে এতটা ঐক্যবদ্ধ দেখিনি। এখানে দলের তরুণ নেতাকর্মী-জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ প্রত্যেক বাসা-বাড়িতে গিয়েছেন। একবার নয়, পাঁচবার করে গিয়েছেন।

‘‘আমি নিজেও আশ্বর্য হয়ে গেছি, পাঁচতলা-সাততলা বেয়ে ভোটারের বাসায় ওঠে দলের বয়স্ক লোকজন ভোট চেয়েছেন। এটাতে আমি খুবই উৎফুল্ল।’’

‘‘আমি অত্যন্ত আশাবাদী, আওয়ামী লীগ যদি এক হয় কেউ আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে পারবে না। এবার কিন্তু সিলেটে এটা হয়েছে। মানুষ আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। এটা কিন্তু কাজের ফসল।’’

অন্যদিকে নির্বাচনে কারচুপির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাবুল।

তার অভিযোগ আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জেতাতে প্রশাসন পক্ষপাতিত্ব করছে, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করছে।

তিনি বলেন, ‘‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকার প্রার্থী যে অবস্থা শুরু করেছেন, তাতে আমি শঙ্কিত। উনি প্রথম দিন থেকে নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলেছেন।

‘‘উনার একটা বিশাল বাহিনী আছে। শতশত বহিরাগত লোকদের এনেছেন। তারা ভোটের দিন প্রভাব বিস্তার করবে। তাছাড়া প্রশাসন পক্ষপাতিত্ব করছে, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করছে। সেই বিষয়টি যদি লক্ষ্য করি তাহলে বুঝতে পারছি তারা ভোটে নয়, জোর করে মেয়র পদ নিয়ে যাবে।’’

‘‘উনারা ভালো করে জানেন যে, ভোটের মাধ্যমে গেলে তারা হারবেন। এটাই তাদের ভয়। এজন্য তারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। কিছু তারা করবে ইভিএম দিয়ে ও প্রশাসন দিয়ে।’’

নির্বাচন কমিশনের আশ্বাস

ভোটের আগে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকাকে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ফয়সাল কাদের। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে সিলেটের ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

‘‘সবকটি কেন্দ্র বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। নিরাপত্তায় কাজ করবে ১০ প্লাটুন বিজিবি। থাকবে র‌্যাব ও পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স। প্রতিটি কেন্দ্রে আনসার সদস্যের পাশাপাশি থাকবে পুলিশ। এ ছাড়াও ৪২টি ওয়ার্ডের জন্য ৪২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট যেকোনও অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচারকাজ সম্পন্নের জন্য মাঠে রয়েছেন ১৪ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।’’

ভোটের নিরাপত্তায় আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য

মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের লক্ষ্যে মাঠে আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। ৫১টি মোবাইল টিম, ১৫টি স্ট্রাইকিং ফোর্স, ছয়টি রিজার্ভ ফোর্স এবং প্রত্যেক জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে ফোর্স থাকবে।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) সুদীপ দাস এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘‘কয়েকটি বিষয়কে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কেন্দ্রে নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকা, কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে সহিংসতার শঙ্কা, যোগাযোগ বিড়ম্বিত কেন্দ্র, অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার শঙ্কাসহ নানা দিক।

‘‘কেন্দ্রগুলোর দূরত্ব বুঝে চারজন, ছয়জন ও সাতজনের ফোর্স মোতায়েন থাকবে। নির্বাচনী মাঠকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুটি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। উত্তর সেক্টর দায়িত্বে থাকছেন উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ এবং দক্ষিণের দায়িত্বে উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) সোহেল রেজা।’’

উপ কমিশনার সুদীপ দাস আরও বলেন, ‘‘গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপর থাকবেন।’’

প্রসঙ্গত, ৭৯ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৪২ ওয়ার্ডে এই সিটিতে এবার পঞ্চমবারের মতো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এবার মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৮৭ হাজার ৭৫৩ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৬০ এবং নারী দুই লাখ ৩৩ হাজার ৩৮৭ জন। মেয়র পদে আট, সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ২৭৩ এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৮৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.