Sylhet Today 24 PRINT

নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ, দুশ্চিন্তায় কৃষক

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, তাহিরপুর |  ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নীতিমালা অনুযায়ী ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় হাওরের ৮১টি ফসল রক্ষা বাঁধের অনেক বাঁধেই মাটির কাজই শেষ হয়নি। যেগুলোতে মাটি পড়েছে সেগুলোতেও শ্লোভ এবং দুরমুজের কাজ হয়নি। অনেক ক্লোজারে বাঁশ, বস্তা ও চাটাই বসানো হয়নি। এখনও লাগানো হয়নি ঘাস।

শনি হাওরের কৃষক রমিজ মিয়াসহ অনেকেই জানান, অনেক বাঁধেই দূরমুজ না করায় দেবে গেছে। এসব কারণে বাঁধ টেকসই হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও জানান, নদী খনন করা হয়নি। আর নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধের কাজ না করায় পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণের প্রথম আঘাত বাঁধের ক্ষতি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছি।

প্রতি বছরের মত এবার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ দায়সারা ভাবে হয়েছে। তাহিরপুর উপজেলার ছোট বড় ২৩টি হাওর রক্ষায় বেশ কয়েকটি বাঁধের নির্মাণ কাজ পরিদর্শনে গিয়ে এমনি তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়াও বাঁধে পাওয়া যায়নি কোনও পিআইসিকে। তবে পাওয়া গেছে পিআইসির কাছ থেকে চুক্তিতে নেওয়া লোকজনকে (ভেকু মেশিন চালক)। যারা পিআইসির কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়েছে বাঁধ নির্মাণ কাজ নিয়ম অনুযায়ী শেষ করে তাদেরকে বুঝিয়ে দিবেন। তারা দাবি করেন মাটির কাজ শেষ কিন্তু বাঁধের চিত্র ভিন্ন। এখন মাটির কাজই করছেন তারা।

তাহিরপুর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপপ্রকৌশলী মনির আহমেদ জানান, তাহিরপুর উপজেলায় ৮১ পিআইসি ১০৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ ১৪ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা। ক্লোজার আছে ১৭টি এর মধ্যে ৭টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ১৩টি বাঁধে দূর্বাঘাস লাগানো সম্পূর্ণ হয়েছে। বাকিগুলো এখনও হয়নি। আর পিআইসিদের প্রথম কিস্তিতে ২৫ পার্সেন্ট দ্বিতীয় কিস্তিতে ১৫ পার্সেন্ট টাকা দেওয়া হয়েছে। বাঁধে কাজের পরিমাণ ৮০ পার্সেন্ট হয়েছে।

কিন্তু হাওর বাঁচাও আন্দোলন তাহিরপুর শাখার যুগ্ম আহবায়ক তুজাম্মিল হক নাসরুম জানিয়েছেন, শুরু থেকেই বলে আসছি বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধ নির্মাণ কাজের সময় শেষ কিন্তু নীতিমালা না মেনেই গড়ে ৬০ শতাংশেরও কম কাজ হয়েছে বাঁধগুলোতে। তাছাড়া দূর্বাঘাস লাগানোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাঁধে দায়সারা ঘাস লাগানোর কাজ চলছে। দুর্বল বাঁধ নিয়ে আমরা ও হাওর পাড়ে কৃষকগণ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়।

এদিকে তাহিরপুর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপপ্রকৌশলী মনির আহমেদের বিরুদ্ধে নানান অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন পিআইসিগণ।

টাংগুয়ার হাওর পাড়ে সাকিল আহমেদ, জমির মিয়াসহ কৃষকগণ বলছেন, সরকার কোটি কোটি টাকার দেয় বাঁধ নির্মাণে। আর পিআইসি নিতে পাগল হয়ে যায় কৃষক নামধারী একটি সিন্ডিকেট। তারা পিআইসি নিয়েই বাঁধে থাকে না থাকে বাড়িতে না হয় উপজেলা সদরে না হয় জেলা সদরে। তারা বাঁধ নির্মাণ কাজের দায়িত্ব চুক্তিতে দিয়ে দেয় ভেকু মেশিনে মাটি কাটার লোকজনকে। ফলে ভাল মন্দ কিছুই বলতে পারি না বাঁধের পাশে থাকার পরও। যার জন্য যেমন খুশি তেমন কাজ হচ্ছে বাঁধে।

মাটিয়ান হাওর পাড়ে কৃষক আমির উদ্দিন, আকিক মিয়া জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে (বড় গর্ত) মাটির কাজ শেষ করা যায়নি। এছাড়া বাঁধ টেকসই করার জন্য সব বাঁধে দূর্বাঘাস লাগানোর কথা থাকলেও বাঁধে দূর্বাঘাস লাগানোর দায়সারা কাজ চলছে, বেশিরভাগ বাঁধে এখনও ঘাস লাগানো হয়নি। আর লাগানো হবে কিনা সন্দেহ আছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা ও উপজেলা সচেতন মহল বলছেন, দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখা গেছে হাওরে। অক্ষত বাঁধে পুনরায় বরাদ্দ ও প্রয়োজনের তুলনায় অধিক বরাদ্দ দেওয়ায় হাওরের কৃষকদের কোনো কাজে আসবে না। তবে বাঁধ নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের লাভ হবে। এছাড়াও বাঁধের কাছ থেকে মাটি কেটে ও ফসলী জমি থেকেও মাটি কেটে বাঁধে দেওয়া হয়েছে। এতে করে কমেছে এক ফসলী বোরো ধানের চাষাবাদের পরিমাণ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হাসান উদ দৌলা বলেন, উপজেলার টাংগুয়ার হাওর, বোয়ালমারা, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, লোভার হাওর, নজরখালি, মহালিয়া, বলদার হাওরসহ ছোট বড় ২৩টি হাওরে চলতি মৌসুমে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ১৭ হাজার ৩৯৩ হেক্টর জমিতে ইরি-বোর ধান চাষ করা হয়েছে। এতে ৮০ হাজার মেট্রিকটনের বেশি চাল উৎপাদন হবে। এর মূল্য ২শ ৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি।

শনি হাওর পাড়ের কৃষক জহুর আলী, মাফিকনুর, হযরত আলী, খোরশিদ আলী, আনিস মিয়া জানান, সময়মত বাঁধগুলোর কাজ শুরু না করে দেরিতে কাজ শুরু করে দায়সারা ভাবেই কাজ হয়েছে। বাঁধগুলো সঠিক ভাবে উঁচুও করা হয়নি। বাঁধগুলো দুর্বল হয়েছে আর সেগুলোতেও ঘাস লাগানো হচ্ছে না। অথচ ঘাসের জন্যও বিপুল বরাদ্দ রয়েছে। তাই এবারও বাঁধ টেকসই হওয়া নিয়ে আমরা শঙ্কিত। আর বাঁধ ভেঙে গিয়ে ফসলের ক্ষতি হলে আমাদের পথে বসতে হবে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, অক্ষত বাঁধ ও অল্প ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধে বিপুল বরাদ্দ দিয়ে এখনও ৬০ শতাংশ কাজ শেষ করতে পারেনি দায়িত্বশীলরা। এছাড়াও অনেক বাঁধ ও ক্লোজারে মাটি পড়েনি। এবারও ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, গড়ে ৮১ শতাংশ কাজ শেষ করা হয়েছে। ১১টি ক্লোজারের কাজও শেষ। এখন যেগুলোর কাজ শেষ হয়েছে সেগুলোতে ঘাস লাগানো হচ্ছে। তবে এবারও ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। সময় বাড়ানোর জন্য কথাবার্তা চলছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.