Sylhet Today 24 PRINT

দিঘির সৌন্দর্যবর্ধনের নামে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে গাছ

শাকিলা ববি |  ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

মাস দুয়েক আগেও সিলেট নগরীর সুবিদবাজার দস্তিদার বাড়ি দিঘির পাড়ে ছিল সারি সারি গাছ। ইট পাথরের উঁচু উঁচু দালানের ভিড়ে নানা প্রজাতির গাছে ঘেরা এই পুকুরটির পাড়েই প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন এলাকাবাসী। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই। কারণ সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দিঘির চারপাশে ওয়াকওয়ে করবে সিলেট সিটি করপোরেশন। তাই নির্বিচারে কাটা হচ্ছে দিঘির পাড়ের প্রায় ২৫ বছরের পুরাতন ৮ থেকে ১০টি গাছ। এমনকি এই গাছগুলো কাটার জন্য নেওয়া হয়নি বন বিভাগের অনুমতিও।

সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী  থাকাকালীন সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কিছু প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়। এর একটি হচ্ছে দস্তিদার বাড়ি দিঘির সৌন্দর্যবর্ধন। এই দিঘির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য দিঘির চারপাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। তাই গার্ডওয়াল তৈরি জন্য দিঘির পাড়ের বেশ কিছু গাছ কাটা হয়।  এই গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হয় সিসিকের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সময়। সাবেক মেয়র এই গাছগুলো আগেই নিলাম করে যান।

এই এলাকার কাউন্সিলর ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই কাজ শুরু হওয়ার আগে সিটি কর্তৃপক্ষ এলাকাবাসীকে জানায় এই দিঘির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কিছু গাছ কাটতে হবে। সিটি যদি গাছ কেটে কাজ করে তাহলে দেরি হবে। তখন এই গাছগুলো কাটার বিষয়ে পঞ্চায়েতে মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সে মিটিংয়ে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীও ছিলেন । মিটিংয়ে এলাকার পঞ্চায়েতের মানুষজন বলেন, গাছ তাদের তাই তারা কাটার ব্যবস্থা করবেন। তখন সিটি করপোরেশেরন কর্মকর্তারা প্রায় ১০টি গাছের তালিকা দেয় পঞ্চায়েত কমিটিকে কাটার জন্য। এরপর থেকে পঞ্চায়েত কমিটি দায়িত্ব নিয়ে এই গাছগুলো কাটাচ্ছেন।

তবে সিলেট বন অফিসের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ নাজমুল আলম বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বেশ কিছু গাছ কাটার অনুমতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু দস্তিদার দিঘির পাড়ের গাছ কাটার অনুমতি সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ নেননি। তারা নিজেদের দায়িত্ব পালন না করে এভাবে এলাকাবাসীকে দিয়ে গাছ কাটাতে পারেন না।

তিনি বলেন, এখন আমাদের আইনগত কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। আমরা শুধু গাছ পরিবহনের সময় আটক করতে পারি। কিন্তু অন দ্যা স্পটে কিছু করার মত সুযোগ অনেক কম। তাই আমরা স্পটে লোক পাঠাচ্ছি। ট্রানজিট রুলে সব জব্দ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি।

তবে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে সিটি করপোরেশনের নির্বিচারে গাছ কাটা ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করাকে সমর্থন করেন না পরিবেশকর্মীরা।

সবুজ রক্ষার কথা বলেছিলেন সিসিক মেয়র কিন্তু তিনিই উৎসাহ দিয়ে ইটের সৌন্দর্য বৃদ্ধির কারণ হচ্ছেন উল্লেখ করে পরিবেশকর্মী শাহ সিকান্দর আহমেদ শাকির বলেন, প্রকৃতিকে প্রকৃতির মত থাকতে দিতে হয়। দিঘি বা পুকুরের পাড় থাকেবে মাটির। দিঘীর সৌন্দর্য মাটির পাড়। এখানে মাটি সারিয়ে ইটপাথরের ওয়াকওয়ে বানানো কখনোই যুক্তিসঙ্গত কাজ নয়। সৌন্দর্যবর্ধন করতে চাইলে দিঘির পাড় মাটির রেখেই করা যায়। এতে খরচও কম হবে। গাছও কাটতে হবে না। কিন্তু এরজন্য প্রয়োজন দায়িত্বশীলদের পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা। সিসিকের প্রকৌশলীরা মনে করেন ইট পাথরের নির্মাণেই সৌন্দর্য। কিন্তু আসলে তা না। প্রকৃত প্রকৌশলীরা প্রকৃতি নষ্ট করে সৌন্দর্যবর্ধন করে না । যার উদাহরণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছে। আমি মনে করি সিসিকসহ সিলেটে বিভাগে কর্মরত সকল প্রকৌশলী ও কর্তা ব্যক্তিকদের পরিবেশবান্ধব নির্মাণ পরিকল্পনার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বেসরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে গাছ কাটার দায়িত্ব দিতে পারে না উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আক্তার বলেন, সিটি করপোরেশন বেসরকারিভাবে স্থানীয়দের গাছ কাটার দায়িত্ব দিতে পারে না। নেহায়েত গাছ কাটতে হলে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে কর্তৃপক্ষ যদি জরুরি মনে করে তাহলে গাছ কাটবে।

তিনি বলেন, একটি দিঘির সংরক্ষণের জন্য ওয়াকওয়ে করাটা প্রধান কাজ না। দিঘিকে সংরক্ষণ করার মানে এই না সৌন্দর্যবর্ধনের নামে গাছ কাটা। একটি দিঘি থাকলেই যে ওয়াকওয়ে করা লাগবে এমনও কোনো নিয়ম নেই বা এটার কোনো প্রয়োজনীয়তাও নেই। দিঘি একটি প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রাকৃতিকভাবেই তার চারপাশের পরিবেশ রাখা যায় মানুষের হাঁটাচলার জন্য। দিঘির চারপাশে মাটির পাড় এটা ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসছে। এখন দিঘির পাড়ের গাছ কেটে ইট বালু দিয়ে ওয়াকওয়ে করতেই হবে এমন নিয়ম কেনে সিলেট করা হচ্ছে আমার বোধগম্য হচ্ছে না। এটা কোনোভাবে পরিবেশসম্মত ও বাস্তবসম্মত না। এটা একটা হাস্যকর বিষয়। এসব ওয়াকওয়ে করাই হয় বাণিজ্যিক স্বার্থে। আমি মনে করি সৌন্দর্যবর্ধনের নামে এভাবে প্রকৃতিকে নষ্ট করা সিটি করপোরেশনের ভুল সিদ্ধান্ত। এরআগে ধোপদিঘি নিয়েও সিটি করপোরেশনের সাথে অনেক দেনদরবার করেছি আমরা। পরবর্তীতে তারা সংরক্ষণ করা নামে ধোপাদিঘিকে একটা খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন এই দিঘি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিল সায়ীদ মো. আব্দুল্লাহ বলেন, আমি এই এলাকায় নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। তাই এখানে কত টাকার কাজ, কতদিন লাগবে কাজ শেষ হতে এসব ব্যাপারে কিচ্ছু আমি জানি না। সাবেক মেয়র ও সাবেক কাউন্সিলরের সময় এই প্রজেক্ট হাতে নেয়া হয়।

গাছ কাটার ব্যাপারে তিনি বলেন,  এখানে পঞ্চায়েত আছে। যেহেতু গাছগুলো এলাকার। তাই সিটি করপোরেশন এই গাছগুলো নিয়ে কোনো কথা বলেনি। গাছ কাটার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন নেয়নি তবে সিটি প্রায় ৮ থেকে ১০টি গাছের তালিকা দিয়েছে পঞ্চায়েত কমিটিকে কাটার জন্য। তারা এই গাছ কাটার দায়িত্ব নিয়ে গাছ কাটাচ্ছেন। তবে আমরা গাছ কাটার এই দায় এড়াতে পারি না। হয়তো আরও দুই ফুট এদিক সেদিক হলে অনেক গাছ কাটা পড়তো না। কিন্তু আমি যেহেতু মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি তাই এই বিষয়টিতে কথা বলতে পারছি না। কারণ এই দিঘির ব্যাপারে আরও আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে সিসিক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো গাছ কাটার জন্য টেন্ডার হয়নি। আমরা আপাতত সব গাছ কাটা বন্ধ রেখেছি। আমারা খবর পেয়েছি দস্তিদার দিঘির গাছ কাটা হচ্ছে। তাই এই গাছ কাটা এখন বন্ধ রেখেছি। তবে কিছু ক্ষেত্রে যেমন একটা গার্ডওয়াল লাগবে এর মাঝখানে গাছ পরেছে সেটাতো কাটতেই হবে। তবে এক্ষেত্রে আমার পরিষদ সঠিক নিয়ম মেনেই কাজ করবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.