Sylhet Today 24 PRINT

ছেলেকে কুরআনে হাফিজ করা হলো না দিলোয়ারের

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ |  ১৪ অক্টোবর, ২০২৪

ছোট চাচার বাড়িতে দাদীর সাথে নিহত দিলোয়ারের তিন সন্তান

নাদিয়া আক্তারের বয়স যখন আট বছর তখন তার অপর এক বোনের জন্ম হয়। নাম রাখা হয় মাহদীয়া আক্তার। মাঝে সানোয়ার হোসেন নামের দুই বছরের আরেক ভাই আছে। তিন ভাই-বোন তারা। সন্তানদের নিয়ে সুখের সংসার ছিলো দিলোয়ার হোসেন দিলার ও তেরা বানু দম্পতির। দিলোয়ার পেশায় একজন দিনমজুর ছিলেন। মানুষের কৃষি জমিতে কাজ করে যা আয় রোজগার হতো তা দিয়ে সংসার চলতো তার। মেয়ে নাদিয়া আক্তার এমদাদুল উলুম কামরুপদলং মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলো। টানাপড়েনের সংসারে অর্থাভাব থাকলেও সুখের অভাব ছিলো না। কিন্তু ছোট মেয়ে মাহদীয়া জন্মের প্রায় একবছর পর সকল সুখ ও জাতপাতকে অগ্রাহ্য করে জাহাঙ্গীর আলম নামক এক প্রেমিকের হাত ধরে গৃহত্যাগী হন তেরা বানু। অবুঝ সন্তানদের নিয়ে সংসার নামক দুঃখের এক মহাসাগরে পড়েন দিলোয়ার হোসেন। দিলোয়ারের বৃদ্ধ মা-ই যেন দুনিয়ার বুকে শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ালেন অবুঝ শিশুদের সামনে। দাদী হয়েও মায়ের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করে লালনপালন করতে লাগলেন নাতি-নাতনীদের।

দেলোয়ারের স্বপ্ন ছিল একমাত্র ছেলে সানোয়ারকে একজন কুরআনে হাফিজ হিসেবে গড়ে তুলবেন। মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাবার জানাজা পড়াবে ছেলে, এমন স্বপ্নই দেখতেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি দিলোয়ারের। ঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হলো তাকে। ঘুমন্ত অবস্থায় শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামে রাতের আঁধারে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে কে বা কারা ছুরিকাঘাতে খুন করে দিলোয়ারকে। এতে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছেন তিন শিশু সন্তান। নাদিয়ার বর্তমান বয়স চৌদ্দ বছর। সানোয়ারের আট ও মাহদীয়ার ছয়ের উপরে বয়স। তাদের মা তেরা বানু আবারও ফিরে আসতে চেয়েছেন সন্তানদের কাছে। পেছনের ছয় বছরের সবকিছু ভুলে আবারও দিলোয়ার হোসেনের সংসারে সংসারী হতে চেয়েছিলেন তিনি। আর এতেই যেন কাল হলো দিলোয়ারের। সকলেই ধারণা করছেন, এমনকি খোদ তেরা বানুও ধারণা করছেন এই হত্যাকাণ্ডের সাথে তার দ্বিতীয় স্বামী জাহাঙ্গীর আলম জড়িত থাকতে পারেন।

জানাজা পড়াতে পারেনি অবুঝ ছেলে
◾ নিজের বসতঘরের স্বপ্ন পূরণ হয়নি
◾ পিতা হত্যার বিচার চান শিশু সন্তানেরা

হত্যাকাণ্ড ঘটার একদিন পর রোববার বিকালে এই প্রতিবেদক যান নিহত দিলোয়ারের ভাইয়ের বাড়ি কামরুপদলং-এর কান্দি গ্রামে। বর্তমানে ছোটভাই সেলিমের ঘরে বসবাস করছেন নিহতের সন্তানরা। কথা হয় নিহতের মা-বাবা, তিন সন্তান ও বড় ভাই আলী হোসেনের সাথে। পরিবারের লোকজন জানান, স্ত্রী চলে যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে খুবই অসুবিধায় পড়তে হয়েছিলো দিলোয়ার হোসেনকে। ছেলেটি খুবই অসুস্থ ছিলো বলে তাকে সব সময় চিকিৎসাধীন রাখতে হয়েছে। পরিবারের একজন না একজনের কোনো না কোনো সমস্যা থেকেই যেতো। এজন্য অনেকদিন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাজে যেতে পারেন নি দিলোয়ার। আয়ের কোনো পথ না থাকায় এক সময় নিজের শেষ সম্বল বসতভিটা বিক্রি করে দেন তিনি। প্রায় আট মাস আগে আশ্রিত হয়ে চলে যান সদরপুর গ্রামের মোস্তার আলী ওরফে মোস্তাই মিয়ার বাড়িতে। সেখানেই তিন সন্তানকে নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। ভিটেমাটিহীন দিলোয়ার একজন দিনমজুর হলেও এলাকায় একজন ভালো মানুষ ছিলেন বলে জানিয়েছেন অন্তত অর্ধশত মানুষ।

বড় মেয়ে নাদিয়া বলেন, আব্বা প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই সানোয়ারকে (ছোট ভাই) নিয়ে সদরপুর পয়েন্টে যেতেন। সেখান থেকে মিঠাই (শিশু খাদ্য) কিনে দিতেন, সে খুশি হয়ে বাড়ি ফিরতো। ঘটনার দিন ভোরে সে আব্বার খোঁজে পয়েন্টে গিয়েছিল কিন্তু পায়নি, খালি হাতে ফিরে এসেছে। আর কোনো দিন সে পয়েন্টে গিয়ে আব্বাকে খুঁজে পাবে না। এই বলে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই বলতে লাগলেন, আমার আব্বার স্বপ্ন ছিলো আমার ভাইকে কুরআনে হাফিজ বানাবেন। মাদ্রাসায় পড়িয়ে আলেম বানাবেন। তিনি চাইতেন তার ছেলে যেন বাবার জানাজার নামাজ পড়ায়। কিন্তু আমার ভাই সে সুযোগ পায়নি। এখন সে এমদাদুল উলুম কামরুপদলং মাদ্রাসায় নূরানি শ্রেণিতে পড়ে।

আপনি কোন ক্লাসে পড়ছেন?
আমি এখন পড়ি না। মা চলে যাওয়ার পড়ে দাদীর সাথে ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনা করতে হয়েছে বলে আর মাদ্রাসায় পড়া হয়নি। আব্বা অনেক সময় আমাদের সবাইকে একসাথে জড়ো করে কান্না করতেন। তরিতরকারি ভালো কিছু না হলে আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ক্ষমা চাইতেন। বলতেন, ‘মা গো, আমার উপর রাগ করো না। আমি তোমাদের ভালোমন্দ কিচ্ছু খাওয়াতে পারি না। সব সময় কাজ মিলে না।’ আমি তখন বলতাম, আব্বা বড় হলে বিদেশে চলে যাবো। তোমার তখন আর কোনো দুঃখ থাকবে না। আব্বা রাগ করতেন। বলতেন, ‘আমি ভিক্ষা করে তোদের খাওয়াবো, তবু তোকে বিদেশ যেতে দেবো না।’ মাঝে মাঝে আম্মার জন্য কান্না করতাম। বাবা বলতেন, আমিই তোদের মা-বাবা। সেদিন আর কাজে যেতেন না।

আপনার বাবা আপনাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন?
উত্তরে নাদিয়া বলেন, আব্বা আমাদের নিয়ে তেমন স্বপ্ন বড় দেখতেন না। তিনি চাইতেন সানোয়ার হাফিজ হোক আর আমাদের নিজেদের একটা ঘর হোক। আমার আব্বার একটা স্বপ্নও বাস্তবায়ন হতে দেয়নি পিশাচের বাচ্চারা। কীভাবে আমাদের সামন থেকে আমাদের আব্বারে তুলে নিয়ে গেলো (আবারও কান্না)? এখন আমার আব্বার স্বপ্ন আমি বাস্তবায়ন করতে চাই। বাড়ি হোক কিংবা না হোক আমার ভাইকে কুরআনে হাফিজ করতে চাই। আর যারা আমার আব্বাকে খুন করেছে তাদের ফাঁসি চাই। আমার আর কোনো চাওয়া নাই। তোমাদের মা এখন কোথায় আছে জানতে চাইলে মেয়ে জানান, আমাদের সাথেই আছেন।

ছেলে হত্যার বিচার চান নব্বই-ঊর্ধ্ব বাবা লিম্বর আলী ও সত্তরোর্ধ মা খতিজা বেগম। তারা বলেন, আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদেরকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে। খুনের বদলা ফাঁসি চাই। ছেলের কাঁদে বাবার লাশ যে কত বড় বোঝা তা সেই বুঝে, যে এই বোঝা বহন করেছে।

দিলোয়ার হোসেন বেশি চলাফেরা করতেন একই গ্রামের বাসিন্দা ইসরাইল মিয়ার সাথে। ইসরাইল মিয়া, নওয়াব আলী ও ইসমাইল আলী বলেন, দিলোয়ার মানুষ হিসেবে খুবই ভালো ছিল। সে কখনোই কোনো ঝগড়াঝাঁটিতে ছিল না। কৃষিকাজ করত। দিন মজুরি করেই দিন কাটতো তার। কোনো দলাদলিতেও ছিল না। তার ছেলে-মেয়েগুলো অসহায় হয়ে গেলো। তার সন্তানগুলোর বিভিন্ন সহযোগিতার দরকার। মোস্তাই মিয়া বলেন, তাকে আমি খুব পছন্দ করতাম। আমার বাড়িতে তাকে বিনা ভাড়ায় থাকতে দিয়েছিলাম। এই ঘটনায় যতটুকু সহযোগিতা করা লাগে আমি করবো।

নিহত দিলোয়ারের বড় ভাই আলী হোসেন ও নিকটাত্মীয় মো. সোহেল মিয়া বলেন, দিলোয়ার হোসেন ভাইয়ের সন্তানগুলো একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছে। তাদেরকে আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করবো। তবে, কে এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজ-কালের মধ্যেই মামলা দায়ের করা হবে। আমরা প্রশাসনের কাছে আশা করছি, যে বা যারা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আমাদের এলাকার কেউ জড়িত আছে কি না তাও খতিয়ে দেখতে হবে।

শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকরাম আলী বলেন, এই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা না হলেও পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরতে খুবই তৎপর রয়েছে। জাহাঙ্গীর আলমের নাম বার বার এসেছে। আমরা তার বাড়িতে খুঁজ নিয়েছি সে পলাতক আছে। এ জন্য তার প্রতি সন্দেহটা আরও বেশি। আশা করছি খুব দ্রুত এই ঘটনার জট খুলে যাবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.