নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৩ অক্টোবর, ২০২৪
সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ, জাফলংয়ে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও পাথর ভাঙার মেশিন নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ গ্রহণের দাবিতে জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
বুধবার (২৩ অক্টোবর) দুপুরে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
এতে বেলা উল্লেখ করে- সিলেটের পিয়াইন, ডাউকী, ধলাই ও রাংপানি নদী এবং বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া ও ভোলাগঞ্জ পাথরের উপর প্রবাহিত স্ফটিক পানির জন্য অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। যা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত পর্যটনস্থল।
২০০৫ সাল থেকে যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে সিলেটের পিয়াইন, ডাউকী, ধলাই, রাংপানি নদী ও লোভাছড়া তাদের সৌন্দর্য্য হারিয়েছে, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটনশিল্প। বিধ্বংসী পাথর উত্তোলনের ফলে নদীগুলোর বিভিন্ন স্থানে পানি ঘোলা হয়ে যায়। পিয়াইন ও ডাউকী নদীর বুকে বালুর স্তুপ ও ট্রাকের মিছিল নিয়মিত হয়ে পড়ে। তাছাড়া বেপরোয়া পাথর উত্তোলনের কারণে সিলেটে ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১০৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩৮ জন।
এছাড়া অনিয়মতান্ত্রিক পাথর উত্তোলনের ফলে ভূমিধ্বস, নদীতীরে ভাঙ্গন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, কৃষি জমি বিলুপ্ত হওয়াসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে । পাথর উত্তোলন ও পাথরবাহী গাড়ি চলাচলের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাথরবাহী ভারী যান চলাচলের কারণে সিলেট-জাফলং ও সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক অত্যন্ত করুণ অবস্থায় পতিত হয়। এছাড়া সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ক্ষতগ্রিস্ত হচ্ছে এবং ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে প্রাণহানির সংখ্যা যেমন বাড়ছে- তেমনি অসংখ্য মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়- উচ্চ আদালতের রায় এবং সরকারের সময়োপোযোগী সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো ২০২০ সালের ৮ জুন সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত ৮টি পাথর কোয়ারির ইজারা স্থগিত করে এবং পাথর উত্তোলন বন্ধ করে। ফলে সিলেটের পিয়াইন ও ডাউকী নদীসহ পাথর মহাল হিসেবে পূর্বেঘোষিত নদী,ছড়া ও প্রকৃতিতে প্রাণ ফিরতে শুরু করে। পর্যটকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। কিন্তু গত ৫ আগস্ট থেকে পাথরখেকোরা নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে পাথর উত্তোলন শুরু করেন যা এখন পর্যন্ত চলমান।
এছাড়া পাথর উত্তোলনকারীরা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে আদালতের নির্দেশে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন ঘোষিত পিয়াইন, ডাউকী ও ধলাই নদী এবং সিলেটের অন্যান্য স্থানে পাথর উত্তোলনের অনুমতি প্রদানে সরকারের উপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছেন। আদালতের নির্দেশে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় পাথর উত্তোলন বন্ধ হলে তার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের উষ্কে দিচ্ছেন। প্রকাশ্যে গণসমাবেশ করছেন। উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এসব কার্যক্রম আদালতকে অবমাননার শামিল।
প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অযান্ত্রিক পদ্ধতিতেও খনিজ সম্পদ আহরণ আইনত অনুমোদিত নয়। এ অবস্থায় সরকার পিয়াইন, ডাউকী, রাংপানি, ধলাই নদী এবং বিছানাকান্দি, উৎমাছড়া, লোভাছড়া, শ্রীপুর ও ভোলাগঞ্জে পর্যটন শিল্পের বিকাশে একটি রুপরেখা ও মাস্টার প্লান প্রণয়ন করতে পারেন। উল্লিখিত জায়গাগুলো থেকে পাথর কোয়ারিসমূহকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সৌন্দর্য যেমন রক্ষা করতে পারেন তেমনি পরিবেশ বিধ্বংসী পাথর উত্তোলন থেকে এলাকাগুলোকে রক্ষা করতে পারেন।
অন্যদিকে, পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পাথর ভাঙ্গার মেশিন পরিচালনার ব্যবসা। কোনো ধরণের নিয়ম নীতি না মেনে চলছে পাথর ভাঙ্গার মেশিন। দিন দিন এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজের একটা শ্রেণি লাভবান হলেও জনস্বাস্থ্য এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিরাট নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জানা গেছে, সিলেটের সদর, দক্ষিণ সুরমা, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় সহস্রাধিক স্টোন ক্রাশার মেশিন আছে। নদীর তীর, সড়ক সংলগ্ন, কৃষিজমিতে এমনকি- ওসমানী আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীরসহ সংলগ্ন স্থানে চলছে অবৈধ এসব পাথর ভাঙ্গার কল। উচ্চ আদালতের রায় অমান্য করে চলছে এসব মেশিন।
স্মারকলিপির মাধ্যমে জানানো হয়- সিলেটের কোয়ারিগুলো থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ, জাফলংয়ে ইসিএ নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও পাথর ভাঙার মেশিন নিয়ন্ত্রণে একটি কমিটি বা জোট গঠন করা হয়েছে। এর নেতৃবৃন্দ হলেন- বেলা সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার, সুজন সিলেট জেলার সভাপতি ফারুক মাহমুদ মাহমুদ চৌধুরী, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম, জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মিসবাহ উদ্দিন, অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম, অধ্যাপক ড. সফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ইন্সটিটিউট অব ডেভেলাপমেন্ট অ্যাফেয়ার্স (আইডিয়া)-এর নির্বাহী পরিচালক নজমুল হক, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সিলেট বিভাগীয় প্রধান অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরীন আক্তার, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম, একডো-এর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ, এফআইভিডিবি-এর নির্বাহী পরিচালক শিরিন আক্তার, টিআইবি সিলেটের এরিয়া কো-অর্ডিনেটর সাজিদুর রহমান, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য সৈয়দ মনির হেলাল, ইউনিট কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট সত্যজিত কুমার দাস, জৈন্তা ছিন্নমূল সংস্থা (জেসিস)-এর নির্বাহী পরিচালক এটিএম বদরুল ইসলাম এবং পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদ (পাসকপ)-এর নির্বাহী পরিচালক গৌরাঙ্গ পাত্র।
স্মারকলিপি প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার, অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরীন আক্তার, অ্যাডভোকেট সৈয়দ মনির হেলাল, অ্যাডভোকেট সত্যজিত কুমার দাস ও বেলা'র ফিল্ড অফিসার শাফায়াত উল্লাহ।