নিজস্ব প্রতিবেদক | ০১ আগস্ট, ২০২৫
সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বোর্ডিং ব্রিজের চাকা বিস্ফোরণে নিহত রুম্মান আহমদ এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। আর দুটি পরীক্ষা বাকি ছিল তার। লেখাপড়ার পাশাপাশি বেসরকারি একটি আউটসোর্সিং কোম্পানিতে চাকরি করতেন রুম্মান আহমদ(২৩)।
তিনবোন দুই ভাইয়ের মধ্যে রুম্মান ছিলেন সবার বড়। বাবা কৃষিকাজ করে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তাই বাবার কষ্ট দূরীকরণে কাজ খোঁজেন রুম্মান। ৩ বছর আগে চাচার মাধ্যমে কাজের সন্ধান পান। কিন্তু যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন তার আগেই চলে গেলেন তিনি।
তার এমন মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছেন না। পরিবার আত্মীয় স্বজন রুম্মানকে হারিয়ে শোকে কাতর। পুরো এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহত রুম্মান নগরের বিমানবন্দর থানাধানী টিলাপাড়া লুছাই গ্রামের মো. মছর মিয়ার ছেলে। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তিনি। বাবা মদরিছ আলী দিনমজুর। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণেই পড়ালেখার পাশপাশি বিমানবন্দরে চাকরি করতেন রুম্মান। পরিবারের সদস্যদের দাবি- সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যদি আইসিউই সেবা পেতেন তবে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত।
ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, গুরুতর আহত অবস্থায় রুম্মানকে ওসমানীতে নিয়ে আসা হলেও আইসিউই খালি না থাকায় তাকে এখানে ভর্তি না করে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওসমানী থেকে জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় রুম্মানকে। সেখানে বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
এই দুর্ঘটনায় আহত আহত বিমানবন্দর থানার মহালদিগ গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর ছেলে এনামুল হক রাগীব রাবেয়া হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন আছেন।
দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, আমরা চারজন বোর্ডিং ব্রিজের চাকা পরিবর্তন করছিলাম। চাকার দুই পাশে দুজন করে ছিলাম। আমি আর রুম্মান ছিলাম একপাশে। হঠাৎ একটি চাকা বিস্ফোরিত হয়। এরপর আর কিছু বলতে পারি না। হাসপাতালে এসে জ্ঞান ফিরে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে বোর্ডিং ব্রিজের পুরনো চাকা খুলে নতুন চাকা বসানোর কাজ করছিলেন ‘সানরাইজ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।
এদিকে, পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়না তদন্ত ছাড়াই মরদেহ দেয়া হয়েছে। সন্ধ্যায় সিলেট নগরীর মানিক পীর টিলায় গোসল শেষে কফিনবন্দি করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় রুম্মানের মরদেহ। শুক্রবার (১আগস্ট) বাদ জুম্মা গ্রামের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা সম্পন্ন হবে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে সিলেট সদর উপজেলার কালাগুল তাওয়াক্কুলিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় পাস করে রুম্মান। পরে ভর্তি হয়েছিলেন সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় আলিম প্রথম বর্ষে। পরিবারের বড় ছেলে রুম্মান। বাবা কৃষি কাজ করেন। পরিবারের হাল ধরতে চাচার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সানরাইজ কোম্পানিতে কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
কফিন বন্দিকালে কান্নারত রুম্মানের চাচা ও বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মচারী আলতাফ বলেন, তাৎক্ষণিক ওসমানী হাসপাতালে আইসিইউ সেবা পাওয়া গেলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেতো। ওসমানী থেকে গিয়ে রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে তৃতীয় তলায় নিয়ে যাওয়ার পথেই সে মারা যায়।
তিনি বলেন, বাবার কষ্ট কমাতে আমার মাধ্যমে তিন বছর আগে এই প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দেয়। পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করতো। আমাদের পরিবারের সবাই বসে সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোম্পানির পক্ষ থেকে আর্থিকভাবে কিছু সহযোগিতা করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আমরা ময়নাতদন্ত ছাড়া নিয়ে এসেছি।
নিহত রুম্মানের আরেক চাচা আব্দুল করিম বলেন, প্রতিদিনের মতো আজ সকালেও তার কর্মস্থলে যায়। কীভাবে দুর্ঘটনাটি হয়েছে আমরা জানি না। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন ঘটনা মানা যায় না। তাই এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করার দাবি জানাচ্ছি।
ফুফাতো ভাই সুয়েব বলেন, গতকাল আমার সাথে ফোনে শেষবার কথা হয়েছিল। দুজনেই মিলে পরিকল্পনা করেছিলাম ছুটি পেলে সিলেটে কোথাও ঘুরতে যাবো। কিন্তু আর যাওয়া হলো না।
এব্যাপারে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, বিমানবন্দর থেকে আড়াইটার দিকে দুজনকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এরমধ্যে একজনের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমাদের এখানে সবগুলো আইসিইউ বেড ফিলাপ ছিল। তাই তারা এখানে ভর্তি না হয়ে অন্য হাসপাতালে চলে যায়।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমেদ বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে কিছু আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে ওই কোম্পানি তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্য আমরা বলে দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে ও শিগগিরই তদন্ত শুরু হবে।