Sylhet Today 24 PRINT

কোন ‘জনস্বার্থে’ হাউসবোট রিকুজিয়েশন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের?

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২৪ আগস্ট, ২০২৫

ছবি ‘দহিম এ লাক্সারি হাউসবোট’-এর ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকবহনকারী বিলাসবহুল হাউসবোট জেলা প্রশাসনের রিকুজিয়েশন করায় সমালোচনা দেখা দিয়েছে। হাউসবোটের উদ্যোক্তরা বলছেন, হুট করে হাউসবোট রিকুজিয়েশন করায় ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। এছাড়া আগে থেকে হাউসবোটটি বুকিং করে রাখা পর্যটকরাও বিপাকে পড়েছেন।

হাউস বোট রিকুজিয়েশন করে জেলা প্রশাসনের দেয়া ‘অফিস আদেশে’ ‘জনস্বার্থে’ এই রিকুজিয়েশন বলে জানানো হয়। তবে প্রশ্ন ওঠেছে- জনগনের কোন স্বার্থ রক্ষায় বিলাসবহুল হাউজবোট রিকুজিয়েশন করতে হয় জেলা প্রশাসনকে।

এই বিষয়টি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের এমন কর্মকান্ড দেশের পর্যটন বিকাশ ও ব্যবসার জন্য অন্তরায় বলে মন্তব্য করছেন নেটিজেনরা।

তবে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে অভিযান চালানোর জন্য হাউসবোট রিকুজিয়েশন করা হয়েছিলো। তবে হাউসবোটের উদ্যোক্তদের আপত্তির কারণে সেদিনের অভিযান বাতিল করা হয়েছে। যা আগেই হাউসবোটের উদ্যোক্তাদের জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে পরিবেশন ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, তাদের কোন গেস্ট আসলে আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাউজবোট নেওয়া হতো। তবে তখন নেওয়া হতো মৌখিক অনুরোধের মাধ্যমে। এই প্রথম হাউসবোটের জন্য লিখিত অফিস আদেশ ইস্যু করতে দেখলাম।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের এই প্র্যাক্টিস চলতে থাকলে তা পর্যটন বিকাশের জন্য বাধা। কারণ টাঙ্গুয়ায় পর্যটক আসেন সাধারণত শুক্র ও শনিবার। এই দুদিনই হাউসবোটের ব্যবসা হয়। এই সময়ে জেলা প্রশাসন বোট নিয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন।

তাছাড়া টাঙ্গুয়ায় অভিযান চালানোর জন্য হাউসবোটের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।   

জানা যায়, গত ২০ আগস্ট সুনামগঞ্জের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. ফজলুল করিম টিপু সাক্ষরিত এক অফিস আদেশ টাঙ্গুয়ার হাওরে চলাচলকারী ‘দহিম এ লাক্সারি হাউসবোট’ কর্তৃপক্ষকে প্রদান করা হয়।

এতে ২২ ও ২৩ আগস্ট এই দুইদিনের জন্য হাউসবোটটি চালকসহ রিকুজিয়েশন করা হয়েছে জানিয়ে বলা হয়, ‘২২ আগস্ট সকাল ৮টার মধ্যে উল্লোখিত হাউসবোটটিসহ চালককে অধিযাচনপূর্বক উপজেলা নির্বাহী অফিসার- তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ-এর নিকট রিপোর্ট করার জন্য অনুরোধ করা হলো’।

এই অফিস আদেশে আরও বলা হয়- ‘এ আদেশ জনস্বার্থে করা হলো। আদেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

দহিম হাউসবোট কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা এই অফিস আদেশ পান ২০ তারিখ রাতে। তবে এর আগেই অতিথিরা ২১ ও ২১ আগস্টের জন্য তাদের হাউেবোটটি বরাদ্ধ নিয়েছিলেন। অফিস আদেশ পাওয়ার আগেই হাউসবোট বরাদ্ধ নেওয়া অতিথিরা সুনামেঞ্জের উদ্দেশে রওয়ানাও করে দেন বলে দাবি তাদের।
 
এ ব্যাপারে দহিম হাউজবোটের ব্যবসায়ীক অংশীদার মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন ফেসবুকে ক্ষোভ জানিয়ে লিখেন-  টাংগুয়ার হাওড়ে আমরা ১৬জন মিলে টাকা ধার দেনা করে একটা হাউজবোট বানাই। টাংগুয়ার হাওড়ের সিজন মূলত ৪মাসের। আর এই ৪মাসের মধ্যে ১৬টা শুক্র-শনিবারেই আমরা মূলত ভালো রেসপন্স পাই।

তিনি লিখেন- ‘২২-২৩ আগস্ট (শুক্র-শনিবার) দহিম হাউজবোট ফুল বুকিং করেন একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা। উনারা কয়েকটা ফ্যামিলি মিলিয়ে মোট ৩২জন আসবেন ওই তারিখে। ইতিমধ্যে উনারা বাস রিজার্ভ করেছেন। উনাদের কয়েকজন অনেক দূর থেকে এসে টাংগাইল থেকে বাসে জয়েন করবেন। সব প্রিপারেশন কমপ্লিট। কিন্তু ২০ আগস্ট বিকালে হোয়াটসঅ্যাপে আমরা একটা মেসেজ পাই। মেসেজটা ওপেন করতেই দেখি ২২-২৩আগস্ট সুনামগঞ্জ ডিসি অফিস থেকে এনডিসি স্যার রিকুইজিশনের পিডিএফ ফাইল পাঠিয়েছেন। আমরা আকাশ থেকে পড়লাম। এত কম সময়ের রিকুইজিশন এর নোটিশে আমরা কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ২২আগস্ট ট্রিপ আর রিকুইজিশন খেলাম ২০আগস্ট বিকালে।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে জেলা প্রশাসকসহ একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বললেও তারা রিকুইজিশন বাতিল করতে রাজী হননি জানিয়ে তিনি আরও লিখেন- এনডিসি স্যার সাফ  উল্টা আমাকে বললো আমাদের গেস্টদের জন্য অন্য বোটে ব্যাবস্থা করতে ,এখন আর কিছু করার নাই।’

মোহাম্মদ শামসুল আরেফিন লিখেন- ‘এভাবে বলা নাই কওয়া নাই মনের ইচ্ছামত রিকুইজিশন মনে হয় একমাত্র আমাদের দেশেই স্বম্ভব। কি কারনে রিকুইজিশন করলো সেটাও উল্লেখ করা নাই। এই দেশে কি এগুলা দেখার কেউ নাই!! যার একটু ক্ষমতা আছে সে যা ইচ্ছা তাই করবে!!! আমি এই ঘটনার বিচার চাই। আমার গেস্টদের কাছে আমার দহিম হাউজবোটের রেপুটেশন নষ্ট হচ্ছে। আমার মান-সম্মান হানি হচ্ছে গেস্টদের কাছে। ভবিষ্যতে গেস্টরা দহিম হাউজবোটে বুকিং দেয়ার আগে ভাববে বুকিং দেয়ার পর রিকুজিশন ও হতে পারে।’

এ ব্যাপারে শুক্রবার বিকেলে সুনামগঞ্জের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. ফজলুল করিম টিপু’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সরকারী জরুরী প্রয়োজনেই আমরা হাউজবোটটি রিকুইজশন করেছিলাম।
তিনি এর কোন বিষয়ে মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করে এ ব্যাপারে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের অতিরক্তি জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সমর কুমার পাল বলেন, টাঙ্গুয়ায় পরিবেশ দূষণ ও মাদকের বিস্তারের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের অভিযান চালানোর জন্য হাউসবোটটি রিকুজিয়েশন নেওয়া হয়েছিলো। তবে হাউজবোট কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে পরে আমরা অভিযানের সিদ্ধান্ত বাতিল করি।

তিনি বলেন, আমরা ২১ তারিখ সকালেই হাউজবোট কর্তৃপক্ষকে অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেই। তবে তার আগের রাতেই তারা এ নিয়ে ফেসবুকে লিখেন। অবশ্য আমাদের সাথে আলোচনার পর তারা স্ট্যাটাসটি ডিলিট করে দিয়েছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিকুজিয়েশন কত সময় আগে করতে হবে এ ব্যাপারে কোন সরকারী নির্দেশনা নেই। প্রয়োজনে যে কোন সময় করা যাবে। তবে মানবিক বিষয় তো আমরা সবসময় বিবেচনায় নেই।

মোবাইল কোর্টের অভিযান চালাতে বিলাসবহুল হাউসবোটের প্রয়োজন কেন এমন প্রশ্নের জবাবে এডিসি বলেন, আগে আমরা স্পিডবোট ও ইঞ্জিন নৌকা দিয়েই অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু এবার বড় আকারে অভিযান চালাতে চাই। বড় অভিযান ছাড়া টাঙ্গুয়ার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। একারণে হাউসবোট রিকুজিয়েশন।

এ ব্যাপারে এ ব্যাপারে দহিম হাউজবোটের ব্যবসায়ীক অংশীদার মোহাম্মদ শামসুল আরেফিনের সাথে শুক্রবার ও শনিবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.