Sylhet Today 24 PRINT

বিদ্যুৎ থেকে বিদ্যালয়- সব সুবিধা থেকেই বঞ্চিত খাসিয়ারা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি |  ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

নানা সমস্যায় রয়েছেন মৌলভীবাজারের ৭টি উপজেলার ৬১টি পুঞ্জিতে বসবাসরত প্রায় ২৫ হাজার খাসিয়া। ভূমির সমস্যা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্কট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা।

স্মরণাতীতকাল থেকে খাসিয়ারা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সিলেট জেলায় বসবাস করে আসছেন। খাসিয়ারা টিলা ও পাহাড়ে পান চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। এছাড়া পানের পাশাপাশি তাঁরা সুপারিও চাষাবাদ করে আসছেন।

সিলেট বিভাগে মোট ৭৩টি পুঞ্জিতে খাসিয়ারা বাস করেন৷  মৌলভীবাজারে ৬১টি, হবিগঞ্জে ২টি এবং সিলেট জেলায় ৭টি খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে। যার মধ্যে শুধু মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৬১টি খাসিয়া পুঞ্জি।

‘খাসি সোশ্যাল কাউন্সিল’ তথ্যমতে তাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার৷ সরকারী হিসাব অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ৫০টি নৃ-জনগোষ্ঠীর বসবাস। এরমধ্যে খাসিয়া জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভূমি সমস্যায় ভুগছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের এসব পুঞ্জিতে অন্তত ২৫ হাজার খাসিয়া বসবাস করছে। তাদের বেশিরভাগ পুঞ্জিতে বন বিভাগের বাধার কারণে বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছায়নি। শিশুদের শিক্ষার জন্য নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্থানীয়ভাবে সরকারি কোনো চিকিসা কেন্দ্রও নেই। যোগাযোগব্যবস্থা খুব খারাপ। বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির তীব্র অভাব। মৌলভীবাজারে প্রায় ৪০টি পুঞ্জিতে এখনো বিদ্যুতের সংযোগ লাইন স্থাপন করা হয়নি। এতে তাদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এসব পুঞ্জির এক একটিতে ৩০ টি থেকে ১০০টি পরিবারের বসবাস। পুঞ্জিগুলোয় হাতেগোনা মাত্র দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিশুদের পড়াশোনার জন্য নিজেদের উদ্যোগে অন্তত ৪০টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।

সম্প্রতি কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও বড়লেখা  উপজেলার কয়েকটি পুঞ্জিতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব পুঞ্জিতে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেই। অনেকে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছে। বিশুদ্ধ পানির অভাব রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক নলকূপে পানি ওঠে না। দূর থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। তীব্র গরমে বিদ্যালয় গুলোয় ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্টে ক্লাস করতে হয়। কয়েকটি পুঞ্জি ছাড়া বেশির ভাগ পুঞ্জিতে যোগাযোগের ভালো কোন ব্যবস্থা নেই। কোথাও কোথাও ওপরে ওঠার জন্য সিঁড়ি থাকলেও অধিকাংশ পুঞ্জিতে এই ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্রী (সমাজ প্রধান) ফিলা পতমী জানান, খাসিয়ারা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে তাদের অধিকাংশ পুঞ্জিতে বিদ্যুৎ ছাড়া বসবাস করতে হচ্ছে। শিশুদের পড়ালেখা হচ্ছে না। মাত্র দুটি সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে। পাহাড়ের দূর্গম এলাকার উঁচু জায়গায় বসবাস, অথচ টিলার ওপরে ওঠার রাস্তা নেই অনেক পুঞ্জিতে।

খাসি সোশ্যাল কাউন্সিলের সভাপতি ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্রী (সমাজ প্রধান) জিডিশন প্রধান সুছিয়াং  বলেন, বেশির ভাগ পুঞ্জিতে বিদ্যুৎ নেই। অথচ শতভাগ বিদ্যুতায়ন জেলা ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা ভূমির অধিকার এখনো পাইনি। আমাদের খাসিয়া পুঞ্জিতে নিজস্ব অর্থায়নে বিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করতে হচ্ছে। সরকারিভাবে বিদ্যালয় গুলোতে একটি ভবনও করা হয়নি। আমরা বিদ্যুতের কথা বললে, বিদ্যুৎ বিভাগ বলে, বন বিভাগের পক্ষ থেকে আপত্তি আছে। এ ছাড়া চিকিৎসা ও যাতায়াতব্যবস্থা একেবারে নাজুক।

মৌলভীবাজার বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. নাজমুল আলম বলেন, খাসিয়া পুঞ্জিতে বন বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ বা রাস্তার জন্য অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। সরকার যদি অনুমতি দেয়, তাহলে আমাদের বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'

মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক এ বি এম মিজানুর রহমান বলেন, 'খাসিয়া পুঞ্জিতে বিদ্যুতের সংযোগ দিতে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই। পুঞ্জিগুলো বনের ভেতর হওয়ায় বন বিভাগের আপত্তির কারণে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়া যাচ্ছে না।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বলেন, খাসিয়া পুঞ্জিগুলো পাহাড়ের ওপরে। এসব পুঞ্জিতে ওঠার সিঁড়িসহ অন্যান্য কাজের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ-ছয়টি বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য গত বছর ২-৩ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বছরও কয়েকটি বিদ্যালয়কে সহযোগিতা করা হবে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.