সাজু মারছিয়াং, শ্রীমঙ্গল | ০৩ জানুয়ারী, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
জন্ম থেকেই আলো দেখেননি রামনারায়ন রবিদাস। কিন্তু চোখে না দেখলেও জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা তিনি প্রতিদিন অনুভব করেছেন হাড়ে হাড়ে। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের পালকিছড়া চা–বাগানে টিনের চালার ঘরে চারজনের পরিবার নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের সংগ্রাম ছিল শুধুই বেঁচে থাকার। দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভিক্ষা করে কোনোমতে সংসার চালিয়েছেন। তবু বুকের গভীরে জমে ছিল একটুখানি স্বপ্ন—একদিন এই ভিক্ষার জীবন ছেড়ে দেবেন, সম্মানের সঙ্গে বাঁচবেন।
অনেক অপমান, লজ্জা আর অনিশ্চয়তা সয়ে রামনারায়ন নেন এক লাখ টাকার ঋণ। ঘরের জমানো শেষ সম্বল যোগ করে কেনেন একটি অটোরিকশা। পরিকল্পনা ছিল—ছেলে অটোরিকশাটি চালাবে, সংসারে নিয়মিত আয় আসবে, ভিক্ষার থালা চিরতরে নামিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাঁচে মাত্র ছয় মাস।
গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে ঘুম থেকে উঠে রামনারায়নের জীবনে নেমে আসে জন্মান্ধতার চেয়েও ভয়ংকর অন্ধকার। উঠোনে এসে দেখেন—অটোরিকশার তালা ভাঙা, ভেতরে কিছুই নেই। বেঁচে থাকার শেষ ভরসাটুকু চোরের হাতে হারিয়ে গেছে।
বুধবার বিকেলে রামনারায়নের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, নিস্তব্ধ এক পরিবেশ। টিনের চালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন পরাজিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। নেই কোনো হাসি, নেই কথার শব্দ। শরীরে গরম কাপড় নেই, চোখেমুখে শুধু ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব।
কাঁপা গলায় রামনারায়ন বলেন, “বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করেই সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে রিক্সাটা কিনছিলাম। ভাবছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে চালাবে, সংসার চলবে। কিন্তু আল্লাহ আর সে সুখ দিলেন না।” এই কথাটুকু বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভেঙে আসে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।
পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাস শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “এই অটোরিক্সাটাই আছিল বিপদের ভরসা। মনে করছিলাম, আর ভিক্ষা করবো না। সংসারটা একটু দাঁড়াইবো। সব শেষ হয়ে গেল। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল।”
রামনারায়নের কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে বেশি হতাশা। তিনি বলেন, “পুলিশে জানাইয়া লাভ কী? এলাকায় কত গরু চুরি হইছে, কোনটার খবর মিলছে? আমারটা কীভাবে পাইবো?”
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সাত মাসে শরিফপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৫টি গরু চুরি হয়েছে। একটি গরুও উদ্ধার হয়নি। এতে চোরদের সাহস বেড়েছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হয়েছে।
এ বিষয়ে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত পরিতাপের। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রামনারায়নের বাড়িতে পুলিশ কেউ খোঁজ নিতেও আসেনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য গণেশ গোয়ালা বলেন, “অন্ধ চোখে যে মানুষটি একটু আলোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আলো চোরের হাতে নিভে গেছে।”