নিজস্ব প্রতিবেদক | ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটের অপেক্ষায় এখন সবাই। শেষ সময়ের হিসেব নিকেষ মিলাচ্ছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা।
এবার ভিন্ন পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নির্বাচন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ এবারের ভোটে অংশ নিতে পারছে না। বরং দলটির পক্ষ থেকে ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ভয়েও ভোট কেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন অনেকে। এছাড়া নীরব ও নিরপেক্ষ ভোটাররা এবারে কতোটা ভোট কেন্দ্রে যাবেন এই প্রশ্নও রয়েছে।
সিলেট জেলার ৬ টি আসনে হিন্দু সম্প্রদায় ও চা শ্রমিক ভোটার রয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ। এই দুই জনগোষ্ঠি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। এবারের নির্বাচনে তারা কতোটা অংশ নিবেন সে নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
ফলে সিলেটে এবার ভোটারদের কেন্দ্রে আনাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপিকেই এই চ্যালেঞ্জে বেশি পড়তে হবে বলে মনে করছেন সিলেটের রাজনীতি সংশ্লিস্ট অনেকে।
তাদের মতে, কিছু ব্যতিক্রম বাদে জামায়াত তাদের সব ভোটারদেরই কেন্দ্রে হাজির করাতে সক্ষম হবে। এ কাজে তাদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে। এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে বিএনপি। ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে বেগ পেতে হবে দলটি। এছাড়া আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় প্রচারেও বিএনপির মাঠ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে গা ছাড়া ভাব দেখা গেছে।
তারা বলেন, ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে না পারলে নির্বাচনী লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়বে বিএনপি। এক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে জামায়াত। ফলে ভোটারদের কেন্দ্রে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ দলটির।
তবে সিলেট-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর বলেন, ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে আমরা উৎসাহিত করছি। আশা করছি, দীর্ঘদিন পর মানুষজন উৎসাহের সাখেথ এবার ভোট দিতে যাবেন।
এবারের এয়োদশ নির্বাচনে সিলেটের ছয়টি আসনে মোট ভোটার ২৯ লাখ ১৬ হাজার ৫৭৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ৯৫৩ এবং নারী ভোটার ১৪ লাখ ১৭ হাজার ৬১০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৬ জন।
ভোটের হিসাব অনুসারে, সিলেট-১ আসনে মোট ভোটার ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৩ জন, সিলেট-২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৯০০ জন, সিলেট-৩ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৬ জন, সিলেট-৪ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১২ হাজার ৯৩৩, সিলেট-৫ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৬ জন এবং সিলেট-৬ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৯ হাজার ৯১ জন।
গত সোমবার সকালে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীরের সাথে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় প্রচারণায় ছিলেন মহানগর বিএনপির এক নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, এবার ভোটারদের কেন্দ্রে নেয়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। আওয়ামী লীগের আমলে গত কয়েকটি একতরফা নির্বাচনের কারণে মানুষের মধ্য থেকে ভোটের আগ্রহ কমে গেছে। নানা কারণে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয়ও পাচ্ছে না। বিএনপির অনেক ভোটারও কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, সিলেট জেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুই লক্ষাধিক, চা শ্রমিকদের অর্ধলক্ষাধিক। সিলেট জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর ভোট সবচেয়ে বেশি রয়েছে সিলেট-১ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে। আসনটিতে মোট ভোটার ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জনের মধ্যে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬ জন পুরুষ ও ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন নারী। সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ আসনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট রয়েছে এক লাখের কাছাকাছি।
আর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালার দাবি এ আসনটিতে চা শ্রমিকের ভোট রয়েছে ২০ হাজারের উপরে। সিলেটের ৬টি সংসদীয় আসনের চারটিতেই রয়েছে চা শ্রমিকদের ভোট। এর আগে চা বাগানের ভোট ব্যাংক ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকার সুযোগ নিতে বিএনপি ও জামায়াত নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। দফায় দফায় বৈঠক করে চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, বাসস্থান, চিকিৎসা ও তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুব্যবস্থাসহ জীবনমান উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সিলেট-১ আসনে ১২টি বাগান রয়েছে। এসব বাগানে ২০ হাজারের বেশি চা শ্রমিকের ভোট রয়েছে। সিলেট-৩ আসনভূক্ত ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৩টি বাগানে প্রায় ৬-৭ হাজার, সিলেট-৪ আসনের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় ১০টি বাগানে ২০ সহস্রাধিক ও সিলেট-৫ আসনের কানাইঘাট উপজেলায় ২টি বাগানে ২ হাজারের বেশি ভোট রয়েছে।
বিগত নির্বাচনগুলোতে চা শ্রমিকদের ৯০ শতাংশই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এবার তাতে ভাটা পড়তে পারে বলে মনে করেন চা শ্রমিক অধিকার আন্দোলন সিলেটের সভাপতি রিতেশ মোদী।
তিনি বলেন, চা শ্রমিকরা ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক। এবার আওয়ামী লগি নেই। তাই শ্রমিকদের মধ্যে ভোট নিয়ে আগ্রহও কম। আমরা তাদের কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে উৎসাহিত করছি।
তবে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন পর মানুষ তার ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। আমরা আশাবাদী মানুষজন ব্যাপক উৎসাহের সাথে এবার কেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করবেন।