Sylhet Today 24 PRINT

গোলাপ ৩০ টাকা, রজনীগন্ধা ২০ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

শনিবার সন্ধ্যা। নগরীর নয়াসড়কের নাইটকুইন পুষ্প কেন্দ্র। ফুল কিনতে এসেছেন দুই তরুণী। ফুলের দাম নিয়ে চলছে বিক্রেতার সাথে দেন-দরবার। বিক্রেতা প্রতি পিছ গোলাপ ৩০ টাকা ও প্রতি স্ট্রিক রজনীগন্ধা ২০ টাকা দাবি করেছেন। এই নিয়ে চলছে তর্কাতর্কি।

দুই তরুণীর একজন শারমিন আক্তার বলেন, আগের দিনও প্রতি পিছ গোলাপ ১০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। অথচ একদিনেই বেড়ে গেছে তিনগুণ দাম। ব্যবসায়ীরা খামাখা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ তার।

তবে বিক্রেতা শফিক আহমদ বলেন, বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে চাহিদা বাড়ায় ফুলের দাম বেড়েছে। প্রতি পিছ গোলাপ ৩০ টাকা ও প্রতি স্ট্রিক রজনীগন্ধা ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। রোববার দাম আরো বাড়বে বলেও জানান শফিক।

দাম নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও শনিবার দিনভর নগরীর ফুলের দোকানগুলোতে ছিল তরুণ-তরুণীদের ভিড়। বিক্রি ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। রোববার ভালোবাসা দিবসে আরো ভালো বিক্রি হওয়ার আশা তাদের।

ভালোবাসা ও বসন্ত এই উপলক্ষকে ঘিরে সিলেটে এখন জমজমাট ফুলের ব্যবসা।

নগরী ঘুরে দেখা গেছে ফুলের ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত এরকম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ষাটের উপর। ফুল ব্যবসার সাথে জড়িতদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ দিবস বাদ দিলে বিক্রির হিসেবে পুরো সপ্তাহ দুই ভাগে বিভক্ত। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সপ্তাহের এই তিনদিন ফুলের চাহিদা বেশি থাকে বলে জানালেন নগরীর সবচেয়ে পুরনো ফুলের দোকান মাধবী পুষ্প কেন্দ্রের মো. ফজলুল।

তিনি জানান, এই দিনগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি হয়। তবে সপ্তাহের বাকি চারদিন অর্থাৎ শনি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত চাহিদা থাকে তুলনামূলক কম।

বুধ থেকে শুক্রবার বিয়ের অনুষ্ঠান থাকে বলেই এসময় ফুলের চাহিদা বেশি থাকে বলে জানান বিক্রেতারা। তারা বলেন, ফুল বিক্রি ছাড়াও এদিনগুলোতে গায়ে হলুদ, মেহদী সন্ধ্যা, বরের গাড়ি এবং স্টেজ সাজাতে প্রচুর পরিমাণে ফুল ব্যবহার হয়।

ভালোবাসা ছাড়া সবচেয়ে বেশি ফুলের চাহিদা থাকে বিজয় দিবস, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবসের মতো বিভিন্ন সরকারি দিবসে। এসব দিবসে ফুলের দোকানগুলোতে বিক্রির পরিমাণ থাকে ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।

নগরী ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ফুল ব্যবসার সাথে জড়িত এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ষাটের উপর। দীর্ঘদিন থেকে সিলেটে ফুলের ব্যবসার প্রসার ঘটলেও ফুল ব্যবসায়ীদের কোন সংগঠন গড়ে উঠেনি এখনও। নগরীর জেল রোড এলাকার গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পাইকারি ফুলের দোকান। তেমনি প্রতিষ্ঠান আশা পুষ্প কেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী আব্দুস সালাম বললেন, ‘আমার এখান থেকে পাইকারি দরে ফুল কিনে নিয়ে ব্যবসা করেন নগরীর অনেকেই। এর বাইরেও জেলার বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা থেকে অনেকেই ফুল নিতে আসেন। সিলেট জেলায় ফুলের দোকান কতটি এটা সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া অনেকে বাসায় বসেই অর্ডার নিয়ে ফুল সরবরাহ করেন। তাদের সংখ্যাও একেবারেই কম নয়।’

প্রসার ঘটেনি ফুল চাষের : প্রায় দুই যুগ ধরে সিলেটে ফুলের ব্যবহার ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও এর সাথে পাল্লা দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রসার ঘটেনি বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের উদ্যোগ নেয়া হলেও তাতে সফলতার গল্প নেই বললেই চলে। বিভিন্ন সময়ে যারা বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেছিলেন তাদের বেশির ভাগই সফল হতে পারেননি। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শহরতলীর তেতলী ইউনিয়নের বলদি গ্রামের মানিক মিয়া।

সিলেটে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করা মানিক মিয়াই এখন পর্যন্ত এই ব্যবসায় সফলতা পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি। এছাড়াও ২০০২ সালের দিকে সিলেটে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের উদ্যোগ নেন ‘গুরু ভাই’। প্রথমে শহরতলীর বটেশ্বর এলাকায় তিনি গোলাপ বাগান করেন। পাঁচ বছর ফুল চাষের পর আরও ভালো ফলনের আশায় তিনি স্থান পরিবর্তন করে বালুচর ও বিমানবন্দর এলাকায়ও ফুলের বাগান করেন। কিন্তু দীর্ঘ ৮ বছরের চেষ্টায় লাভের মুখ দেখা হয়নি তার। তার মতে সিলেটের আবহাওয়া ও মাটি ফুল চাষের পুরোপুরি অনুকূলে নয়।

তিনি বলেন, ঢাকার টঙ্গি বা জয়দেবপুরে যে গাছ থেকে ১০ থেকে ১৫টি গোলাপ পাওয়া যায় সেখানে সিলেটে একই গাছ থেকে ৩ থেকে ৫টির বেশি গোলাপ উৎপাদন হয় না। তুলনামূলক কম ফলনের ফলে একে লাভজনক করা কঠিন হয়ে যায়।

তার মতো আরো অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের চেষ্টা করেছেন। শহরতলীর নগরীর এয়ারপোর্ট রোড ও পাঠানটুলা এলাকায়, বালুচরে, বিশ্বনাথ উপজেলায় এবং লালাবাজারে নানা সময়ে বিভিন্ন উদ্যোক্তা বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের কেউ এক বছরে আবার কেউ কেউ দুই-তিন বছরের মাথায় সেই চেষ্টা বাদ দিয়েছেন।
নিজের ৮ বিঘা জমির উপর ১৯৯৯ সালে প্রথমে শখের বসে পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেছিলেন মানিক মিয়া। টানা এক যুগ ধরে তিনি ফুল চাষ করে আসলেও এবছর বিরতি দিয়েছেন।

তিনি জানান, ‘চারা রোপণের সময়টায় দেশের বাইরে থাকায় এবছর ফুল চাষ করা সম্ভব হয়নি। আগামী মৌসুমে নতুন চারা রোপণের সব ধরনের প্রস্তুতি এখন থেকেই সেরে রাখছি। তবে সিলেটের মাটি ও পরিবেশ ফুল চাষের উপযুক্ত নয় এরকম কথায় দ্বিমত পোষণ করেছেন সিলেটের একমাত্র সফল ফুল চাষি মানিক মিয়া।

তিনি বলেন, ‘ছোট পরিসরে ফুল চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়। যারা একথা বলছেন তারা সামান্য জায়গা নিয়ে ফুল চাষ করেছেন। ফলে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় তারা টিকে থাকতে পারেননি।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ফুল চাষে লাভবান হতে হলে ন্যূনতম ৪০-৪৫ বিঘার জমিতে ফুল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। এরকম উদ্যোগ নিতে পারলে ফুল বিক্রি করে বছরে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব।

 

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.