Sylhet Today 24 PRINT

লাউয়াছড়ার নান্দনিক রেললাইন বাড়াচ্ছে ঝুঁকিও

ছবি তোলা ও কনটেন্ট তৈরির জন্য জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন পর্যটকরা

সাজু মারছিয়াং, শ্রীমঙ্গল |  ২৪ মার্চ, ২০২৬

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে সবুজ বনের বুক ছিঁড়ে চলে গেছে রেল লাইন। ঘন সবুজের ভেতরে মনোরম এই রেললানেই হয়ে ওঠেছে পর্যটকদের জন্য বিপদের কারণ।

লাউছাছড়া ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের প্রায় সকলেই এই রেললাইনে বসে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেন। বসে বা হাত ধরাধরি করে হেঁটে গল্পও করেন অনেকে। রেললাইনের উপরে এমন কর্মকান্ডের ফলে বাড়ছে ঝুঁকি। এ রেললাইনে ইতিমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে রেললাইনে সেলফি তোলার ক্রম বর্ধমান প্রবণতা গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনার পর।

২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের লাওয়াছড়া বন এলাকায় একটি লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে সেলফি তোলার সময় ট্রেনের ইঞ্জিনের ধাক্কায় এক ছাত্র নিহত হন। রেল কর্মকর্তারা জানান, আখাউড়া থেকে সিলেটগামী ইঞ্জিনটি ছাত্রটিকে ধাক্কা দিলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই বনাঞ্চলে রেললাইনের ওপর বা চলন্ত ট্রেনের কাছে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা ক্রমশ সাধারণ হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের মধ্যে এমন ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

লাউয়াছড়ার ঘন গাছপালার কারণে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়, যা প্রায়শই রেললাইনের পাশের দৃশ্যমানতা বাধাগ্রস্ত করে; ফলে সময়মতো এগিয়ে আসা ট্রেন শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক রাশেদ মাহমুদ বলেন, সবাই ছবি তুলছে আর ভিডিও বানাচ্ছে। আমি বাদ পড়তে চাইনি।

তিনি স্বীকার করেন যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরির আকাঙ্ক্ষা প্রায়শই নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, অনলাইনে লাইক ও ভিউয়ের জন্য অনেকেই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, রেললাইনের ভিউটা এতো সুন্দর যে ফটো না তুললে মনে হয় ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে মনে হয়।

লাউয়াছড়ার স্থানীয় বাসিন্দা হাতিম আলী সাথে কথা বলে জানা যায় যে, দুই বছর আগে লাউয়াছড়া রেললাইনের ওপরের সেতুতে ছবি তুলতে গিয়ে দুজন পর্যটক আহত হয়েছিলেন। পরে অনেক কষ্টে তাদের উদ্ধার করা হয়।

তিনি বলেন, আমরা দেখি লাউয়াছড়া রেললাইনম্যানের কথা কেউ শোনেও না। পর্যটকরা লাউয়াছড়া রেললাইনে ছবি তুলতে গিয়ে বড় ঝুঁকি নেন। কিন্তু কোনো ছবিই জীবনের চেয়ে বড় নয়—এটা সবার বোঝা উচিত। এই ঝুঁকি নিয়ে কত মানুষ ছবি তোলে। অনেকেই আহত হয়েছেন। গত বছর সেলফি তুলতে গিয়ে এক ছাত্রের মৃত্যু হয়।

তিনি আরও বলেন, পর্যটকরা আগে এভাবে এত ছবি তুলতেন না। এখন সবাই যেখানে-সেখানে মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তুলছে। সচেতনতা না বাড়লে এমন দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।

আরেকজন পর্যটক নুসরাত জাহান বলেন, রেললাইনে ছবি তোলা “সম্পূর্ণ অনুচিত এবং তিনি কড়া নজরদারির দরকার। মানুষ মনে করে ট্রেন আসার আগে তাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে, কিন্তু এক মুহূর্তের ভুল সিদ্ধান্ত মারাত্মক ঝুকিতে ফেলতে পারে।

সাংবাদিক সালাউদ্দিন শুভ বলেন, দেশের বিভিন্ন অংশে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যা একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। যেটিকে অনেকে রোমাঞ্চ বলে মনে করেন, তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

রেল কর্মকর্তারা বলেন, ট্রেন প্রায়শই উচ্চ গতিতে চলে এবং কাছাকাছি থাকা লোকজনকে সতর্ক করার জন্য যথেষ্ট শব্দ তৈরি নাও করতে পারে। এছাড়াও, চলন্ত ট্রেনের তীব্র বায়ুচাপের কারণে ব্যক্তিরা ভারসাম্য হারাতে পারেন।

সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, সচেতনতার অভাব, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবই এই প্রবণতার কারণ।

তিনি বলেন, একটি ছবির জন্য জীবন বিপন্ন করা কখনোই উচিত নয়। রেললাইন সেলফি তোলার জায়গা নয়।

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রেললাইনের উপর যেন কেউ ছবি তুলতে না পারে সেজন্য এই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ নিরুৎসাহিত করতে এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক রয়েছে, বিশেষ করে পর্যটনের ভরা মৌসুমে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.