Sylhet Today 24 PRINT

মানবপাচারকারীদের ভয়ঙ্কর ‘গেম’, স্বপ্নের ইউরোপ অথবা মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ৩০ মার্চ, ২০২৬

ভূমধ্যসাগর হয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ প্রবেশের আগে অভিবাসীদের অপেক্ষা করতে হয় লিবিয়ার ত্রিপোলির উপকূলীয় এলাকার একটি ঘরে। সেই ঘরে চলে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার প্রশিক্ষণ। অনেক সময় চলে নির্যাতনও। এরপর ছোট নৌকায় করে ইউরোপের উদ্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয় সাগরে।

মানব পাচারকারীরা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার নাম দিয়েছে ‘গেম’। ইউরোপে পৌঁছাতে পারা না-পারায় নির্ধারণ হয় এই মরণ 'গেম’-এর জয়-পরাজয়।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক তরুণ নিয়ে ইউরোপ যেতে এই ‘গেম’-এ চড়েন। বেকারত্ব ও দারিদ্রতাকে পুঁজি করে একটি দালালগোষ্ঠি চড়ে অংকের টাকা নিয়েও তরুণদের ঠেলে দেয় এই মৃত্যুর খেলায়। প্রবাসীবহুল সিলেট অঞ্চলের তরুণদের মধ্যে যে কোনভাবে ইউরোপ যাওয়ারর একটি প্রবণতা রয়েছে। তাদের অনেকে ঝুঁকি জেনেও ইউরোপ যেতে ‘গেম’-এর আশ্রয় নেন।

লিবিয়া থেকে ছোট নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ জন। শনিবার এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আবার আলোচনায় এসেছে ‘গেম’এর বিষয়টি।

সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সবাই তরুণ। গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তারা। সাগরে পথ হারিয়ে ছয় দিন ছিলেন। অনাহারে তারা মারা যান। পরে সঙ্গীরা লাশ ভাসিয়ে দেন সাগরে। শুক্রবার গ্রিস উপকূল বোটে থাকা জীবিতদের উদ্ধার করে সে দেশের কোস্টগার্ড।

সাগরে মারা যাওয়াদের একজন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার টিয়ারগাঁওয়ের বাসিন্দা শায়েক আহমদ। বৃদ্ধ বাবা আখলুস মিয়া জমি বিক্রি করে টাকা তুলে দেন দালালদের হাতে।

৪ মাস শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, কুয়েত, দুবাই, মিশর, লিবিয়া নানা দেশে ঘুরানো হয় শায়েককে। অবশেষে ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ভূমাধ্যসাগর হয়ে গ্রিসে যাওয়ার জন্য নৌকায় তুলে দেওয়া হয়।

২১ মার্চ এই ‘গেম’ হয় শায়েকদের। তার আগে ২০ মার্চ তিনি কথা বলেন পরিবোরের সাথে। সেসময় টাকা দিয়ে হলেও তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার আর্জি জানান। ফোনে জানান, নির্যাতন করা হচ্ছে, অমানবিক পরিবেশে দিন কাটছে। বাবাকে অনুরোধ করেন, ২৩ মার্চের মধ্যে যদি নৌযানে রওনা দিতে না পারেন, তাহলে যেন তাকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।

শায়েক আহমদের সাথে এসব আলাপের কিছুটা ফোনে রেকর্ড করে রাখেন তার পরিবারের সদস্যরা। এরকম একটি অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, শায়েক তার পরিবারের সদস্যদের বলছেন, ৫০, ৬০ বা ৭০ হাজার যত টাকা লাগে তাাদেরকে দেও। দিয়ে আমাকে উদ্ধার কর। না হলে আমি বাঁচবো না।

শায়েখের বাবা আখলুস মিয়া বলেন, এই আলাপের পরদিনই ‘গেমে’ তুলে দেওয়া হয় শায়েককে। এরপর আর তার সাথে যোগযোগ করা যায়নি। কালকে ( শনিবার) মৃত্যুর খবর পেয়েছি।

কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, দলাল আমার ফুত নাইমরে সাগরো ফালাইয়া মারিলিছে। তোমরা তারে আইন্যা দেও। তোমরা দলালের বিচার করো।’

গেম এর এই ভয়াবহতার কথা উঠে এসেছে নিহত অন্যদের পরিবারের সাথে আলা করেও। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যেতে ৭ থেকে ১২৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দালালদের দিয়েছেন একেকজন। তবুও ইউরোপ যাওয়া হয়নি তাদের।
দালালরা আটকে রেখে তাদের মারধর করেছে। খাবার দেয়নি। পরিবারের সাথেও যোগাযোগ করতে দেয়নি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.