Sylhet Today 24 PRINT

সাগরে মারা যাওয়া মুন্নার শেষ স্ট্যাটাস: ‘দেশে এক গ্লাস পানি তুলে খেতে হয়নি, এখন প্রবাসে কী করছি’

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি |  ৩০ মার্চ, ২০২৬

‘মায়ের কথা বারবার মনে পড়ে। দেশে আমাকে এক গ্লাস পানি নিজের হাতে তুলে খেতে হয়নি। আর এখন, সেই আমি প্রবাসে কী করছি। ভাবছি, মাকে কত কষ্ট দিয়েছি, মা কত কষ্টই না পেয়েছে আমার জন্য।’

ফেসবুকে মাকে নিয়ে এ রকম আবেগমাখা পোস্ট দিয়েছিলেন ফাহিম আহমদ মুন্না (২০)। ছোট্ট একটি ভিডিও ক্লিপে মানিব্যাগে রাখা মায়ের ছবি তুলে ধরে সেটি দেখিয়ে এ কথাগুলো ছিল তাঁর। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দেওয়া এটিই ছিল ফেসবুকে তাঁর শেষ পোস্ট।

এরপর সৌদি আরব থেকে লিবিয়ায় পাড়ি জমান। সেখান থেকে লিবিয়া-গ্রিস ঝুঁকিপূর্ণ ‘গেমে’ ওঠে ভূমধ্যসাগরে আরও ১২ জনের সঙ্গে প্রাণপ্রদীপ নিভে যায় এই তরতাজা তরুণের। মা–বাবার একমাত্র সন্তান ফাহিমের সেই ফেসবুক পোস্টে ওপরের অংশে মাকে নিয়ে আরও কয়েকটি লাইন লেখা ছিল। সেই কথাগুলো এখন তাঁর স্বজন, বন্ধুদের কান্নায় ভাসাচ্ছে। ফাহিম লিখেছিলেন, ‘বোকাসোকা আম্মুটাই দিন শেষে আমার জন্য কাঁদে, মন খারাপ করে, মনভরে দোয়া করে!’

ফাহিম আহমেদের বাড়ির সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামে। বাবা ফয়েজ উদ্দিন ১৮ বছর ধরে আছেন সৌদি আরবে। মা হেলেন আক্তার গৃহিণী। ফাহিমের মৃত্যুর খবরে মা শয্যাশায়ী। ফাহিম পড়তেন দোয়ারাবাজার সরকারি ডিগ্রি কলেজে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। ভূমধ্যসাগরে বোটে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা যাওয়া ১২ জনের মধ্যে ফাহিম বয়সে সবার কনিষ্ঠ।

ফাহিমের চাচা তাইজুল ইসলাম জানান, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বিদায় নেন ফাহিম। এরপর যান সৌদি আরবে। সেখানে দুদিন ছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে নেওয়া হয় লিবিয়ায়। লিবিয়া থেকে অন্যদের সঙ্গে তাঁকে গেমে (ছোট রাবারের নৌযান) তোলা হয় ২১ মার্চ। ২৮ মার্চ শনিবার বিকেলে ওই বোটে থাকা এলাকার আরেক যুবক ফাহিমের মৃত্যুর খবর বাড়িতে জানান। ওই যুবকই জানান, তাঁদের বোটে ৩৮ জন ছিলেন। বোটটি পথ হারিয়ে সাগরে ছয় দিন ছিল। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ফাহিমসহ বোটে থাকা ১৮ জন মারা যান। তাঁদের লাশ দুই দিন বোটে ছিল। পরে ফাহিমসহ অন্যদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। বোটটি ২৭ মার্চ গ্রিসের উপকূলে ভিড়লে জীবিতদের উদ্ধার করে সেখানে একটি ক্যাম্পে নিয়ে রাখা হয়।

এভাবে ঝুঁকি নিয়ে, অবৈধ পথে ফাহিমকে গ্রিসে পাঠানোর পক্ষে ছিলেন না তাঁর আত্মীয়রা। কিন্তু তাঁর নাছোর আবদারে পরিবারের সদস্যরা বাধ্য হন তাঁকে পাঠাতে। তাঁর এক আত্মীয়ের মাধ্যমেই পাঠানো হয়েছিল। ওই ‘দালাল’র মাধ্যমে এলাকার আরও কয়েকজন একইভাবে গেমে লিবিয়া থেকে গ্রিসে গিয়েছেন।

তাইজুল ইসলাম বলেন, ফাহিম সবার বড় আদরের ছিলেন। দেখতে ছিলেন খুবই সুন্দর। পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন তিনি। এখন পুরো পরিবারের আশা-ভরসা সাগরে ডুবে গেল। এলাকার সবাই তাঁর এমন করুণ মৃত্যুতে মর্মাহত।

স্থানীয় বোগলাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মিলন খান বলেছেন, ‘উন্নত জীবনের আশায় মানব পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে এলাকার অনেকেই অবৈধ পথে ইউরোপে যাচ্ছে। এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এক তরুণের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে একটি পরিবারের সব শেষ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া উচিত।’

দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অরূপ রতন সিংহ ফাহিমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা ও স্বজনদের সান্ত্বনা দিয়েছেন। আর ফাহিমের মা হেলেন আক্তার সবার কাছে আকুতি জানাচ্ছেন, ছেলের লাশটি, তাঁর মুখটা একবার দেখার জন্য।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.