Sylhet Today 24 PRINT

ডিজেল সঙ্কটে হাওরের ধান কাটা ব্যাহত

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২১ এপ্রিল, ২০২৬

আছে বন্যার চোখ রাঙানি। যাতে তলিয়ে যেতে পারে ধান। শিলাবৃষ্টিতেও নষ্ট হচ্ছে ফসল। ধান ৮০ শতাংশ পাকার পরই কেটে ফেলার তাগাদা দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। কিন্তু এমন আশঙ্কা আর তাগাদা সত্ত্বেও দ্রুত ধান কাটতে পারছেন নাসেুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।

ডিজেল সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে ধান কাটা। চাহিদা মতো ডিজেল পাচ্ছেন না কৃষকরা। পেলেও কিনতে হচ্ছে উচ্চ মূল্যে। এছাড়া ফলে ধান কাটার খরচ বেড়ে গেছে। কাটার গতিও মন্থর। খরচ বেড়ে যাওয়ায় ধানের নায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৩৭টি হাওর রয়েছে। এবার সুনাগঞ্জে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে ধান কাটা। ধান কাটার শ্রমিকসহ মাঠে কাজ করছে ৬০২টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন। তবে ডিজেল সঙ্কটে অনেেকে মেশিন ব্যবহার করতে পরছেন না।

জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাখিমারা হাওরের কৃষক তিতন মিয়া বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ধান কাটায় হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করতে পারছেন না তিনি। আবার শ্রমিকও মিলছে না। ফলে বন্যার শঙ্কা সত্ত্বেও দ্রুত গতিতে ধান কাটতে পারছি না।

তিনি বলেন, সরকার ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে। তারপর ডিজেল মিলছে না। আরও ২০/৩০ টাকা বেশি দিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিনতে হচ্ছে।

এই এলাকার হারভেস্টার মেশিনের মালিক ও কৃষক আবদুল কাদির বলেন, আমার একটা মেশিন বন্ধ আছে। তেল সংকটের কারণে কৃষকরা ভাড়া নিচ্ছেন না।


চলতি মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে হারভেস্টার মালিকদের নিয়ে ধান কাটার বিষয়ে সভা করা হয়। সভায় উপস্থিত হারভেস্টার মালিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। নির্ধারিত রেটে তারা যেন হাওরে কৃষকদের ধান কাটায় সহায়তা দেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন।

হাওরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ধান কাটায় হারভেস্টার ঠিক মতো সেবা দিতে পারছে না। ডিজেল আনতে গেলে অধিকাংশ সময় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে মালিকদের।

তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরপারের বড়দল গ্রামের কৃষক ও হারভেস্টার মালিক মুছিহুর রহমান মিলন জানান, ৫ এপ্রিল কৃষি অফিস থেকে কর্মকর্তারা বলে দিয়েছিলেন ডিজেলের কোনো সংকট নেই। বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখছেন। ডিলারদের কাছে ডিজেল কেনার জন্য কৃষি অফিস থেকে একটি টোকেন দেওয়া হয়। সেই টোকেন পেতে হলে এনআইডি কার্ড ও হারভেস্টারের কাগজপত্রে কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নিতে হচ্ছে। স্বাক্ষর নিতে গিয়ে হারভেস্টার মালিকদের লাইনে দাঁড়াতে হয়। এভাবে দিন পার হয়ে যায় টোকেনে স্বাক্ষর পেতে। পরে সেই টোকেন নিয়ে কোনো রকম ডিলারের দোকানে পৌঁছতে পারলে ডিলার বলে দেয় আজ ডিজেল শেষ হয়ে গেছে। তারপর ডিজেল না নিয়ে খালি ট্যাঙ্কি হাতে ফিরতে হয়।

এ অবস্থায় তারা বাধ্য হয়েই ডাম্পের বাজার, শ্রীপুর বাজার ও তাহিরপুর বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া দামে ডিজেল কিনে হাওরে কৃষকদের ধান কাটছেন বলে জানান তিনি।

প্রতি লিটার ডিজেল বিভিন্ন হাট থেকে ১৫০ টাকা দরে কিনেছেন বলে জানান এই উপজেলার কৃণকরা।

সুলেমানপুর গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, হারভেস্টার মালিকরা এ বছর প্রতি কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) দুই হাজার টাকা দরে ধান কাটছেন। গত বছর এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা নিয়েছিলেন। ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই অধিক মূল্যে ধান কাটাচ্ছেন।


সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার একাধিক কৃষক জানান, হারভেস্টাার মেশিন চালাতে প্রতিদিন ১০০-১২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয় এবং পাওয়ার থ্রেসার মেশিনে লাগে ১২-১৫ লিটার। কিন্তু এই পরিমাণ ডিজেল প্রতিদিন পাওয়া যায় না। ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে সম্প্রতি কয়েকজন কৃষক উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউএনওর দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন।

ছাতক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান বলেন, পাম্প থেকে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সুপারিশ করা হয়েছে। মাঠের ৮০ শতাংশ ধান পাকলেই দ্রুত কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, কৃষকরা যাতে নির্বিঘ্নে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেন এ বিষয় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, হারভেস্টার মালিকরা যেন ডিজেল পেতে হয়রানির শিকার না হন, সে লক্ষ্যে মালিকদের এনআইডি কার্ড ও হারভেস্টার মেশিনের কাগজপত্র অফিসে নিয়ে এলে দ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নপত্র দিয়ে দিচ্ছেন।

এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ডিজেলের সঙ্কট নেই। তবু সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা সমস্যা আছে। একারণে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আমরা এখন কৃষকদের রেশনিংয়ের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ করছি।

তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের ধান কাটার জন্য অতিরিক্ত ডিজেল বরাদ্ধ চেয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। তবে এখনো বরাদ্ধ পাওয়া যায়নি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.