Sylhet Today 24 PRINT

দিরাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: পদ আছে ৫৮টি, কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন

মুজাহিদ সর্দার তালহা, দিরাই  |  ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

হাওরাঞ্চল অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা ও আশপাশ এলাকার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে।

চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকট, অচল যন্ত্রপাতি এবং সরকারি দায়িত্বে অবহেলার কারণে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো।

২০১৭ সালে ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও বাস্তবে সেই উন্নয়ন কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও সহায়ক কর্মী নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীদের ভোগান্তি, আর সেবার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনুমোদিত ৫৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। শূন্য রয়েছে ৪৮টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৮৩ শতাংশ। ফলে হাসপাতালের সার্বিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এছাড়া উপজেলার জগদল ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে একজনও চিকিৎসক না থাকায় সেটি কার্যত তালাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতেও একই চিত্র বিরাজ করছে। এতে করে উপজেলা জুড়েই স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে উপজেলার স্বাস্থ্যসেবা।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে অধিকাংশ সময় চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ডিএমএফ (ডিপ্লোমা মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) ইন্টার্নরা। জটিল রোগী এলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মেডিকেল অফিসার পাওয়া যায় না। স্থানীয় রোগী হলে ফোনে ডেকে আনা হয়, অন্যথায় ইন্টার্নদের দিয়েই চিকিৎসা চালানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ‘ডাক্তার নেই’ বা ‘যন্ত্রপাতি নেই’ এই অজুহাতে রোগীদের সিলেটে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে।

স্থানীয়দের দাবি, একই চিকিৎসকরা প্রাইভেট চেম্বারে সময় দিয়ে রোগী দেখলেও সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা দেন না এবং রোগীদের সিলেটে যাওয়ার পরামর্শ দেন। হাসপাতালের আরেকটি বড় সমস্যা টেকনিশিয়ান সংকট। ল্যাব, এক্স-রে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবল না থাকায় সেগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত কোনো টেকনিক্যাল সাপোর্ট না থাকায় সামান্য ত্রুটিতেই বছরের পর বছর মেশিন বিকল অবস্থায় পড়ে থাকে। এ কারণে রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে অতিরিক্ত খরচে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে, নিয়মিত চিকিৎসক পরিদর্শন করেন না, খাবারের মান নিম্নমানের এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটও রয়েছে। এতে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

দিরাই বাজারের ব্যবসায়ী মুহিম মিয়া বলেন, সরকার হাসপাতালের ভবন বড় করেছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান দেয়নি। মানুষ কোনো সুবিধা পাচ্ছে না বরং ভোগান্তি বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল মিয়া বলেন, হাসপাতালে যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবল না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যায় না, ফলে বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

আবুল ফজল বলেন, প্রাইভেট চেম্বারে গেলে ডাক্তার পাওয়া যায়, কিন্তু হাসপাতালে গেলে সিলেটে যেতে বলা হয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সব মিলিয়ে, শূন্যপদ পূরণ, টেকনিশিয়ান নিয়োগ এবং চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে দিরাইয়ের মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এমন ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের লাখো মানুষ কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. প্রশান্ত দাস তালুকদার বলেন, শয্যা বাড়ানো হলেও সেই অনুপাতে জনবল বাড়েনি এবং টেকনিশিয়ানের অভাব রয়েছে। সীমিত জনবল নিয়েই সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.