Sylhet Today 24 PRINT

সড়কে ঠিকাদারের লোভের বলি নিরীহ শ্রমিকরা

ঝুঁকি নিয়ে পিকআপ ভ্যানে যাত্রী পরিবহন

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ০৪ মে, ২০২৬

ভোরের আলো ফোটার আগে ঘর ছাড়তে হয় তাদের। জীবিকার আশায় জড়ো হন নির্ধারিত স্থানে। সব দিন কপালে কাজ জোটে না। কাজ জোটা মানে ‘ভাগ্য সুপ্রসন্ন’।

সেসব ‘ভাগ্য সুপ্রসন্ন’ মানুষের বহনকারী ডিআই ট্রাক দুর্ঘটনায় পড়ে একসঙ্গে প্রাণ হারালেন আটজন নির্মাণ শ্রমিক।

রবিবার (৩ মে) সকাল ৬টার দিকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের বহনকারী ডিআই ট্রাককে ধাক্কা দেয় কাঁঠালবাহী একটি ট্রাক। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন চারজন।


হাসপাতালে নেওয়ার পর আরো চারজনসহ মোট আট প্রাণহানি ঘটেছে। আহত সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও সে সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, সিলেট নগরের আম্বরখানা থেকে ডিআই ট্রাকে করে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার গোয়ালাবাজারে যাচ্ছিলেন এসব শ্রমিককে। সেখানে একটি বাড়ির ছাদের ঢালাই কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাদের।

সিলেটে ভোরের সড়কে শ্রমিকদের এমন মৃত্যুর মিছিল নতুন নয়। কেবল নিহতের সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে হইচই পড়ে। এর ঠিক তিন বছর আগে ২০২৩ সালের ৭ জুন ভোরে একইভাবে ডিআই ট্রাকে করে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার সময় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে একসঙ্গে প্রাণ দিয়েছিলেন ১৪ জন শ্রমিক। কাকতালীয়ভাবে দুই দুর্ঘটনায় অদ্ভুত মিল।

পেছনের তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ জুন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দক্ষিণ সুরমার নাজির বাজারের কুতুবপুরে শ্রমিক বহনকারী ডিআই ট্রাকের সঙ্গে ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুর্ঘটনাস্থলেই ৯ নির্মাণ শ্রমিক এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরো পাঁচজনসহ মোট ১৪ জন প্রাণ হারান। আহত হন ১০ জন। তারাও নগরের আম্বরখানা থেকে গোয়ালাবাজার যাচ্ছিলেন একটি বাড়ির ঢালাইকাজে অংশ নিতে।

দুই দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উভয় ক্ষেত্রেই ডিআই ট্রাকে শ্রমিকদের পাশাপাশি নির্মাণ কাজের যন্ত্র মিক্সার মেশিন তোলা হয়েছিল। একটি ডিআই ট্রাকে মিক্সার মেশিন তোলার পর যে ফাঁকা অংশ থাকে সেখানে সাত আটজন মানুষের জায়গা থাকে। অথচ দুর্ঘটনা দুটির ক্ষেত্রে ২০ জনের বেশি শ্রমিককে ডিআই ট্রাকে তোলা হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

সড়কে শ্রমিকদের এসব মৃত্যু মিছিলের কারণ অনুসন্ধানে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব কারণ পাওয়া গেছে।

নগরের লোহারপাড়া এলাকার একটি কলোনিতে থাকেন হামিদ মিয়া। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সকালে আমরা কাজের সন্ধানে আম্বরখানায় জড়ো হই। সেখান থেকেই বিভিন্ন সাইটের ঢালাইকাজের জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়।’

প্রায়ই দূর-দূরান্তে কাজে যেতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ডিআই ট্রাকে মিক্সার মেশিন তোলার পর জায়গা আর কতটুকু থাকে অনুমান করেন। সেই জায়গায় ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিককে গাদাগাদি করে উঠতে হয়। তখন আর নিজেকে মানুষ মনে হয় না; বস্তা বা এ রকম কিছু মনে হয়। ঠিকমতো শ্বাস নেওয়া যায় না। সকালের রাস্তা ফাঁকা থাকে, চালকও বেপরোয়া গতিতে চালান। প্রতিমুহূর্তে দুর্ঘটনার ভয় নিয়ে পার করতে হয় আমাদের।’

এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে উঠেন কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে হামিদ মিয়া বলেন, ‘এভাবে না গেলে নেবে না। অন্য কাউকে নিয়ে নেবে। বউ-বাচ্চা ঘরে। জীবিকার তাগিদে নিরুপায় হয়ে উঠতে হয়। ঠিকাদার তো খরচ বাঁচাতে এসব করে।’

এ বিষয়ে একাধিক ঢালাই ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘এটা তো নতুন কিছু নয়। সব সময় এভাবেই আমরা ঢালাইয়ের কাজে নিয়ে যাই। মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিন ঘটলে না হয় আমাদের দোষ।’

দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অ্যাক্টিভিস্ট মঞ্জুর মোহাম্মদ। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সকালে আম্বরখানা বা যেসব জায়গায় শ্রমিকরা জড়ো হন, সেখানে গেলেই দেখবেন ঢালাইকাজে এসব শ্রমিককে নিয়ে যাওয়ার সময় ঢালাইয়ের মিক্সার মেশিনের সঙ্গে তাদের ডিআই ট্রাকে তুলে ফেলা হয়। ভারী ওজনের মিক্সার মেশিনের সঙ্গে শ্রমিকদের তোলায় বিধি-নিষেধ রয়েছে। কিন্তু সেটা কেউ তোয়াক্কা করে না। মেশিনের পাশাপাশি ক্ষেত্র বিশেষে ২০ থেকে ২৭ জনের বেশি তুলে ফেলা হয়। এতে হয়তো কিছু টাকা বাঁচে ঠিকাদারের, কিন্তু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ ওই গাড়ির ভারসাম্য পুরোপুরি ঠিক থাকে না।’

মঞ্জুর মোহাম্মদ আরো বলেন, ‘ভোরে এসব শ্রমিককে নিয়ে যাওয়া হয় যে কারণে ডিআই ট্রাকের চালকের চোখেও অনেক ক্ষেত্রে যেমন ঘুম থাকে, তেমনি সড়কে যেসব যানবাহন চলে, সেগুলো হয়তো সারা রাত ধরে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এসেছে ক্লান্ত চালকের চোখে ঘুম থাকে। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটে যায়।’

দীর্ঘদিন ধরে ট্রাকসহ ভারী যানবাহন চালিয়েছেন। পরে মেকানিক হিসেবে কাজ করেছেন। এখন চালকদের প্রশিক্ষণ দেন আবদুর রহমান। এ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বলেন, ‘ওভারলোড হলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ে। ধরুন তিন টন ট্রাকে যদি আপনি ১০ টন তোলেন, তাহলে স্বাভাবিক অবস্থায় ব্রেক কষলে যতটা সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, এক্ষেত্রে ততটা না। এ ক্ষেত্রে চালক যতটা সতর্ক থাকা দরকার, ততটা থাকেন না। বরং বেপরোয়া গতিতে চালান। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এগুলো বন্ধ করতে হবে।’

সিলেট মহানগর পুলিশের দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদারের পর্যবেক্ষণও মিলে যায় পূর্ববর্তী বক্তাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর ট্রাকের হেলপারকে আমরা আটক করেছি। সে বলেছে, গাড়িটা লোড ছিল। তিন মুখের ওখানে তার লোড গাড়ি নামছিল এ সময় বিপরীত দিকে আসা ডিআই ট্রাকও ওভার স্পিডে ছিল। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় লোড গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ডান দিকে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে।’

অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে জানিয়ে ওসি বলেন, ‘পণ্যবাহী বাহনে তো মানুষ চলাচল নিষিদ্ধ। শ্রমিক শ্রেণি কী, আমাদের দেশে সুযোগ পেলে অনেক সচেতন মানুষও উঠে পড়েন। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সবার টনক নড়ে। পরে আর খোঁজ থাকে না। ফলে এটাই চলছে।’

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.