সিলেটটুডে ডেস্ক | ০৬ মে, ২০২৬
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক শিবির নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেছেন, বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাদের যারা রক্ষা করতো তাদেরকে তারা রক্ষা করতে পারে না। ফলে এর পরিনতি তাদেরকেই বরণ করতে হয়। ১৯৭৫ সালে বিএনপিকে যারা ক্ষমতায় আনার পথ তৈরী করেছিল বিএনপি তাদের তারা রক্ষা করতে পারেনি। এবারো ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যারা বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার সুযোগ করে দিয়েছিলো তাদেরকেও তারা রক্ষা করতে চায় না। এজন্য তাদেরকে ভবিষ্যতেও তাদের কঠোর মুল্য দিতে হবে। কারণ জুলাই সনদ উপেক্ষা ও গণভোটের রায় বাতিলের সিদ্ধান্ত বিএনপিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।
বুধবার (৬ মে) বিকেলে ‘জুলাই ঐক্য’ সিলেট আয়োজিত বহুল প্রত্যাশিত রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে গৃহিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘গণরায় বাস্তবায়ন ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. ইসমাঈল পাটোয়ারী।
এতে শিশির মনির আরও বলেন, আমাদেরকে এখন কোনটা সংস্কার কোনটা সংশোধন সেটা শেখানো হচ্ছে। অথচ জুলাই সনদের প্রথম কথাই হচ্ছে সংস্কার। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে গণভোটে হ্যা বিজয়ী হলে জাতীয় সংসদের পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।| ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে। এছাড়া ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চ কক্ষ গঠিত হবে। কিন্তু বিএনপি জাতির সাথে প্রতারণা করেছে। তারা আবার সেই কথা বড় গলায় সংসদেও তুলে ধরছে। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী বলছেন- ঐসময় জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করলে যদি নির্বাচন না দেয়, তাই রাজী হয়েছিলাম। একজন মন্ত্রী পার্লামেন্টে এমন মিথ্যা প্রতারণামুলক বক্তব্য দিতে পারে না। এই ঘটনা বিশ্বের অন্য কোন দেশে হলে ইতোমধ্যে তাকে পদত্যাগ করে চলে যেতে হতো।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির আরও বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা না হয় তাহলে দেশে ৫ বছর পর অটোমেটিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা হবে। এর বিপরীতে ফের গণঅভ্যুত্থান হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সিলেটে এসেছিলেন। এখানে খাল খননসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে গেছেন। এগুলো কি প্রধানমন্ত্রীর কাজ? খাল খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড আছে, খেলাধুলার জন্য ক্রীড়া অধিদপ্তর এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উচিত সঠিক লোককে সঠিক জায়গায় বসানো। তাহলে অটোমেটিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। আর এটাই হবে পরিবর্তন কিংবা সংস্কার।
তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো সঠিকভাবে কাজ না করলে সুনামগঞ্জের হাওর রক্ষা করা সম্ভব হবে না| এজন্য পাউবোকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে উন্নয়ন নিশ্চিত হবে না এবং গণতন্ত্র ঠেকসই হবে না। রাষ্ট্রের আয় ব্যয়ের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না। এজন্যই প্রয়োজন সংস্কার। অন্তর্বর্তীকালিন সরকারের আমলে আমরা দীর্ঘ ৮ মাস ২৭টা দেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক সিস্টেমকে পর্যালোচনা করে জুলাই সনদ প্রস্তুত করেছিলাম। ঐক্যমত্য কমিশনের বৈঠকে বিএনপিই প্রথম গণভোটে রাজী হয়েছিল। যখন জুলাই চার্টার হলো তখন তারা বললেন- এটি কিভাবে বাস্তবায়ন হবে। তখন সংবিধান স্থগিত করে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করা হয়। তখন তারা বললো- আমরা গণভোটে রাজী আছি। কিন্তু এখন বিএনপি গণভোটের রায়কেই বাতিল করে দিয়েছে। এজন্য তাদের জন্য খারাপ পরিনতি অপেক্ষা করছে। আমাদের বিশ্বাস বিএনপির শুভ বুদ্ধির উদয় হবে- তারা জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিবেন। অন্যথায় ইতিহাস তাদেরকে ক্ষমা করবে না। কারণ এদেশে আবারও গণঅভ্যুত্থান হবে।
সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুক্তাবিস উন নুরের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ডা. ইসমাঈল পাটোয়ারী বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত করেছিল ধীরে ধীরে সেই সপ্ন পূরণের সকল পথ বন্ধ করা হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের উচিত ছিল সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে জুলাই আকাঙ্খাকে বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তারা উল্টো পথে হাটঁছেন। মেধা ও যোগ্যতাকে বাদ দিয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সমুহকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এই ধরণের কর্মকাণ্ড শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরিপন্থীই নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত করে।
তিনি বলেন, আমরা দেখলাম সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলছেন বিএনপি জুলাই সনদকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। আবার সংসদ অধিবেশনে দেখলাম সরকারের মন্ত্রী বলছেন তখন যদি নির্বাচন না দেয় সেই আশঙ্কা থেকে বাধ্য হয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম। জনগণ তাহলে কোনটা বিশ্বাস করবে। সরকারের পক্ষ থেকে সেটা পরিস্কার করে বলা উচিত। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেয়া রায়কে উপেক্ষা করা উচিত নয়। জুলাই শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। অন্যথায় দেশে ফের ফ্যাসিবাদ কায়েম হবে। ছাত্র-জনতা মাঠে নামলে আবারো গণঅভ্যুত্থান হতে পারে।
জুলাই ঐক্য সিলেটের অন্যতম সমন্বক সিলেট জেলা বারের আইনজীবী মোহাম্মদ আব্দুর রবের সঞ্চালনায় নগরীর দরগাগেইটস্থ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ-কেমুসাসের শহীদ সুলেমান হলে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন- কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ কেমুসাসের সভাপতি ভাষা সৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান, সাবেক অধ্যক্ষ কবি কালাম আজাদ, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগর সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারী মোহাম্মদ শাহজাহান আলী, এনসিপি সিলেট মহানগর যুগ্ম আহ্বায়ক নেসারুল হক চৌধুরী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই যোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন শিশির। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জুলাই ঐক্য সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক ড. নূরুল ইসলাম বাবুল।
বক্তব্য রাখেন- শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল এন্ড কলেজ মিরাবাজারের অধ্যক্ষ গোলাম রব্বানী, সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. হোসাইন আহমদ ও সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ কেমুসাসের সভাপতি মাসউদ খান বলেন, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে রায় দিয়ে হ্যা ভোট দিয়েছে। সুতরাং ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায়কে উপেক্ষা করলে বিএনপি সরকার জাতির সাথে প্রতারণা করবে। তা তাদের ধবংস ডেকে আনবে। জুলাই আকাঙ্খা পরিপন্থী কোন সিদ্ধান্ত বিএনপি এবং দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। সরকার যত দ্রুত এটা অনুধাবন করবে ততই তাদের জন্য ভালো।