নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৯ মে, ২০২৬
সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্ধ থাকা পাথর কোয়ারিগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘পরিবেশ বাঁচাতে’ সনাতন পদ্ধতিতে হবে পাথর উত্তোলন। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন সরকার-সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশগত ভারসাম্য যাচাই ও জরিপ করতে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিবেশ আইন মেনে ও যন্ত্রের বদলে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করা হবে। এর মাধ্যমে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
জানা গেছে, দেশে গেজেটভুক্ত পাথর, সিলিকা বালু, নুড়িপাথর ও সাদা মাটি মহালের সংখ্যা ৫১টি। এর মধ্যে ১৭টির ইজারা স্থগিত রাখে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। তখন থেকে বন্ধ রয়েছে সিলেট জেলার ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, লোভাছড়া, রতনপুর, উৎমা ও শ্রীপুর এবং সুনামগঞ্জের বালুমিশ্রিত পাথরমহাল ধোপাজান ও ফাজিলপুর।
তবে বর্তমান সরকার নতুন করে জরিপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জরিপের পর ‘পরিবেশ বাঁচিয়ে’ পাথরমহাল খোলার সিদ্ধান্ত হবে।
গত বৃহস্পতিবার ‘সিলেট বিভাগের পাথর ও বালুমিশ্রিত পাথর কোয়ারির সর্বশেষ অবস্থা ও করণীয়’ বিষয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এতে স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ভার্চুয়ালি অংশ নেন।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জের কোয়ারিগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, খনিজ সম্পদ আইন এবং বিদ্যমান বিধিমালা অনুসরণ করে কোথায় সীমিত আকারে পাথর উত্তোলন করা যেতে পারে, তা নির্ধারণে একটি সমন্বিত জরিপ চালানো হবে।
তিনি বলেন, ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) ঘোষিত জাফলংসহ সংবেদনশীল এলাকাগুলো এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে। এসব অঞ্চল বাদ দিয়ে অন্যান্য স্থানে নিয়ন্ত্রিতভাবে কোয়ারি ইজারা দেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। ‘পরিবেশ বাঁচিয়ে’ পাথর উত্তোলনের উদ্দেশ্যে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জানা গেছে, কমিটিতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের প্রতিনিধি, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন পরিচালক এবং দুই জেলার পুলিশ সুপার এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের সদস্য করা হবে। প্রয়োজনে কমিটি আরও বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
‘পরিবেশ বাঁচিয়ে’ পাথর আহরণ বা উত্তোলনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সিলেটে পরিবেশবাদী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য আবদুল করিম চৌধুরী কিম।
গতকাল শুক্রবার তিনি বলেন, ‘বোমা ও মেশিন ব্যবহার করে পাথর উত্তোলন করা হয়। এসব যন্ত্রে কেবল পরিবেশ বা প্রকৃতি ধ্বংস হয়নি, বরং শ্রমিকদের প্রাণহানিও ঘটিয়েছে। শাহ আরেফিন টিলা নামক এলাকায় একের পর এক শ্রমিকের প্রাণহানির অন্যতম কারণ ছিল এটি। কিন্তু এর প্রতিকারে পাথরমহাল বন্ধ বা শ্রমিকদের কর্মহীন থাকা কোনোভাবে কাম্য নয়। আমরা চাই, পাথর আহরণ বা উত্তোলনে যেন যন্ত্র বসানো না হয়।
সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন প্রকৃতি বা পরিবেশের জন্য হুমকি নয়।’ তিনি জানান, যে কমিটি সার্ভে করবে, সেই কমিটিতে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিদের যুক্ত রাখা উচিত।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে দেশের গেজেটভুক্ত পাথর, সিলিকাবালু, নুড়িপাথর, সাদা মাটি মহালগুলোর ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত এক সভায় পরিবেশ সংকটাপন্ন বিবেচনায় ১৭টি মহালের ইজারা দেওয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পাথরমহাল এলাকায় পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতা ও যন্ত্রচালিত পাথর উত্তোলন বন্ধ করতেই ইজারা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
সরকারের এ নির্দেশনায় পাথর মহালসংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করে। পাথর উত্তোলন ও পরিবহনে জড়িত শ্রমিকরা বিপাকে পড়ে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে বারকি ও পাথরশ্রমিকরা।