Sylhet Today 24 PRINT

বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কার পাচ্ছেন নৃপেন্দ্রলাল দাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০৯ মে, ২০২৬

বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬’ পাচ্ছেন শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক নৃপেন্দ্রলাল দাশ। তার সঙ্গে এ বছর এই পুরষ্কার পাচ্ছেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বুলবুল ইসলাম। রবীন্দ্রসাহিত্য গবেষণা ও রবীন্দ্রসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর তাঁদের এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী সোমবার ১১ মে ২০২৬ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পুরস্কার প্রদান করা হবে।

চার দশকের গবেষণা ও সাহিত্যসাধনা
১৯৪৯ সালের ৬ নভেম্বর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নৃপেন্দ্রলাল দাশ। পিতা দেবেন্দ্রনাথ দাশ এবং মাতা লাবণ্য দাশ। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর শিক্ষকতা, সাহিত্যচর্চা ও গবেষণাকে জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে তিনি রবীন্দ্রসাহিত্য, রবীন্দ্রদর্শন, পত্রসাহিত্য এবং সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সিলেট অঞ্চলে রবীন্দ্রচর্চার ইতিহাস ও প্রভাব নিয়ে তাঁর মৌলিক গবেষণা বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে বিশেষভাবে সমাদৃত। স্থানীয় সাহিত্য ও ইতিহাসকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা
গবেষণা, মানবিক মূল্যবোধ ও জ্ঞানচর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ নভেম্বর ২০২৫ সালে নৃপেন্দ্রলাল দাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ–সংশ্লিষ্ট “ড. মহানামব্রত ফাউন্ডেশন গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড ২০২৫” এবং সম্মাননাসনদ লাভ করেন।

এছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকেও তিনি সংবর্ধনা ও সম্মাননা পেয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ও সম্পাদনা
নৃপেন্দ্রলাল দাশের প্রকাশিত প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও সাহিত্যগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১২৫। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্ম ১০ খণ্ডে প্রকাশ করার ইচ্ছা রয়েছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—
শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রপত্র প্রাপক সিলেটিরা
রবীন্দ্রনাথ রসপ্রস্থান
হেমন্তবালার রবীন্দ্রনাথ
গীতাঞ্জলি, প্রজ্ঞা ও পূষণ

তিনি রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম সিলেট আসেন এবং মৌলভীবাজার কুলাউড়া উপজেলায় রাত্রি যাপন করেন। সেইদিন কে স্মরণীয় করে রাখতে বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় আর সেই অনুষ্ঠানে গীতাঞ্জলি, প্রজ্ঞা ও পূষণ স্মারক গ্রন্থ সম্পাদনা করেন কবি নৃপেন্দ্র লাল দাশ । এছাড়া মৌলভীবাজারে রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত “রবিরাগ” সম্পাদনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
তাঁর কবিতার বইয়ের মধ্যে রম্যাণি রুচিরা, অনীহার অন্ধকারে আমি এবং বৈশালীর প্রতি সনেটগুচ্ছ উল্লেখযোগ্য।

রবীন্দ্রচর্চার পাশাপাশি তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, রাধারমণ দত্ত এবং হাসন রাজা–কে নিয়েও গবেষণা করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, লোকসংস্কৃতি ও স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক লেখালেখিতেও রয়েছে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা।

ব্যক্তিগত লাইব্রেরি গড়ার স্বপ্ন
নিজস্ব সংগ্রহে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত লেখকদের প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে বলে জানান নৃপেন্দ্রলাল দাশ। দীর্ঘদিনের সংগ্রহ করা এসব বই নিয়ে একটি ব্যক্তিগত লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রয়েছে তাঁর। তা সম্ভব না হলে কোনো উপযুক্ত গ্রন্থাগারে বইগুলো দান করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।

ইউরোপ সফর ও সংবর্ধনা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে তিনি তিন মাসব্যাপী নরওয়ে, ইতালি, ফ্রান্স, সুইডেন ও পোল্যান্ড সফর করেন। সফরকালে বিভিন্ন দেশে সাহিত্যপ্রেমীদের সংবর্ধনা লাভ করেন এবং প্রবাসী বাঙালি সমাজের সঙ্গে সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে মতবিনিময় করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে তিনি সম্মাননা ও স্মারক উপহারও পেয়েছেন।

রবীন্দ্রচর্চা নিয়ে অনুভূতি
পুরস্কার ঘোষণার পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় নৃপেন্দ্রলাল দাশ বলেন,
“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমার গবেষণার প্রেরণা। এই পুরস্কার আমার দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি এবং দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল।”

তিনি আরও বলেন, “শ্রীমঙ্গল ও সিলেট অঞ্চলের রবীন্দ্রচর্চাকে গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরাই ছিল আমার আজীবনের লক্ষ্য।”

নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে তিনি বলেন, রবীন্দ্রসাহিত্য মানুষকে মানবিক মূল্যবোধ শেখায়। তাঁর ভাষায়, “কবিরা সবকিছু ভেতর থেকে উপলব্ধি করেন, সাধারণ মানুষ শুধু দেখে। তাই নতুন প্রজন্মকে বেশি বেশি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।”

রবীন্দ্রনাথের কুলাউড়া সফর নিয়ে গবেষণা
নৃপেন্দ্রলাল দাশ জানান, ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রথম ট্রেনযোগে গৌহাটি হয়ে সিলেট সফরে আসার পথে গভীর রাতে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় রাত্রিযাপন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও তথ্যসংগ্রহ করে আসছেন।সেইদিনটি কে স্মরণীয় করতে নিজ সম্পাদনা স্মারক প্রকাশ করেছেন।

পরিবার ও ব্যক্তিজীবন
বর্তমানে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে শ্রীমঙ্গলের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার পল্লবী ব্লকে নিজ বাসভবনে বসবাস করছেন তিনি। তাঁর স্ত্রী একজন সাবেক শিক্ষিকা। বড় ছেলে সিলেট নর্থইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত এবং ছোট ছেলে নরওয়েতে অবস্থান করছেন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.