নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৩ মে, ২০২৬
সব আসামি খালাস পাওয়ার ঘটনায় ১৪ বছর পর আবার আলোচনায় এসেছে সিলেটে বাসে অগ্নিসংযোগে চিত্রনায়িকা শাবনুরের বাবার নিহত হওয়ার বিষয়টি। এই মামলায় মঙ্গলবার (১২ মে) বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক (পরবর্তীতে গুম) ইলিয়াস আলীসহ দলটির ৩৮ নেতাকর্মীকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন আদালত।
কী ঘটেছিলো সেদিন
২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ঢাকায় বিএনপির সমাবেশে সিলেটে বিক্ষোভ কর্মসূচী ডাকে বিএনপি। পূর্ব নির্ধারিত এই কর্মসূচী চলাকালে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দক্ষিণ সুরমার চণ্ডিপুল বদিকোনা এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়া হয়। এতে পুড়ে যায় সিলেট-হবিগঞ্জ সুপার এক্সপ্রেস যাত্রীবাহী বাস। এসময় আরেকটি যাত্রীবাহী বাস ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটে।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বাসের ভেতরেই মারা যান এক বৃদ্ধ। ২০ ডিসেম্বর বেওয়ারিশ হিসেবে ওই ব্যক্তির লাশ নগরীর মানিকপীরের গোরস্থানে দাফন করে পুলিশ।
কীভাবে জানা গেলো নিহতের পরিচয়
দুর্ঘটনার ১৩ দিন পর, ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি মারা যাওয়া ব্যক্তির পরিচয় পরিচয় সনাক্ত হয়। জানা যায় ওই বৃদ্ধের নাম কাজী শাহজাহান চৌধুরী (৭০)। তিনি চিত্র নায়িকা শাবনূরের বাবা।
নিহতের দ্বিতীয় স্ত্রী পরিচয় দিয়ে জোৎস্না বেগম নামের এক নারী শাহজাহান চৌধুরীর পরিচয় শনাক্ত করেন। সেসেময় তিনি দাবি করেন, নিহত ব্যক্তি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শাবনূরের বাবা। ওই নারীর বক্তব্য অনুযায়ী, নিহতের নাম কাজী শাহজাহান চৌধুরী (৭০)। বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানায় এসে পায়ের জুতা ও মুখমণ্ডলের ছবি, হাতের ঘড়ি ও কোমরের বেল্ট দেখে স্বামীর পরিচয় শনাক্ত করেন তিনি।
জোৎস্না বেগম সেসময় আরও জানান, মৌলভীবাজার ও সিলেটে একটি গানের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গত ১৪ ডিসেম্বর নাছির বাড়ি থেকে রওনা হন। ১৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের অনুষ্ঠান শেষে তিনি সিলেটে আসছিলেন।
জোৎস্না পুলিশকে আরও জানিয়েছিলেন, কাজী শাহজাহান চৌধুরী ৩টি বিয়ে করেছেন। তার প্রথম স্ত্রী শাবনূরের মা। সর্বশেষ মৌলভীবাজারে স্বপ্না বেগম নামে এক জনকে বিয়ে করেন।
ইলিয়াস আলীরা কীভাবে আসামি
প্রায় দেড় দশক আগের কাজী শাহজাহান চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় সিলেট বিএনপি নেতাদের অভিযুক্ত করে মামলা করা হয়।
গাড়িতে আগুনের ঘটনায় ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে দক্ষিণ সুরমা থানায় দুটি মামলা হয়। এসআই মো. হারুন মজুমদার বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা এবং পরিবহন ব্যবসায়ী শাহ নূরুর রহমান বাদি হয়ে দ্রুত বিচার আইনে আরেকটি মামলা করেন।
এসব মামলায় ইলিয়াস আলীসহ ৩৮ বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়।
মামলায় আসামি করা হয় বিএনপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী, তৎকালীন কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান, সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সেক্রেটারি আজমল বখত সাদেক, বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট এটিএম ফয়েজ, নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনার, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমেদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক শাকিল মোর্শেদ, বিএনপি নেতা কোহিনুর আহমদ, আশিক, রাসেল, তোরন, সামছুল ইসলাম টিটু, এম এ মান্নান, অলিউর রহমান, কামাল হোসেন, রুবেল আমিন সুমন (কাউয়া সুমন), তোফায়েল আহমদ সুহেল, শরিফ আহমদ, আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুল বাছিত, সুহেল, মো. কামরুজ্জামান, শাহাব উদ্দিন, মো. শাহজাহান, শামীম, তাজুল ইসলাম, আলী মিয়া, হোসেন আহমদ, ছালেক আহমদ, জোবায়ের আহমদ, ফখরুল ইসলাম ফারুক ওরফে টাকু ফারুক, লুৎফুর রহমান, মো. জাহেদ হোসেন, জালাল আহমদ, মুসা মিয়া, জিহাদ চৌধুরী, মো. আব্দুল মজিদ, মজম্মিল আলী, আঙ্গুর মিয়া ও সুহেদুর রহমানকে।
অবশেষে খালাস
আলোচিত এই মামলায় মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও জেরা শেষে সিলেটের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল (জেলা ও দায়রা জজ আদালত)-এ বিচারক মো. শরিফুল ইসলাম রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সব আসামিকে খালাস প্রদান করা হয়। এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
বাসে তাহলে আগুন দিলো কে?
সব আসামি খালাস পাওয়ায় ঘটনায় প্রশ্ন দেখা গিয়েছে, ২০১১ সালে ওই বাসে তবে আগুন দিলো কারা? আগুনে একজন মৃত্যুর দায় তাহলে কাদের।
এ ব্যাপারে মামলা থেকে খালাস পাওয়া সিলেট জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মকসুদ আহমদ বলেন, হবিগঞ্জের বাস সমিতির দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে ওই বাসে আগুন দেওয়া হয়। এতে একজন মারা যান। পরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের ফাঁসানো হয়েছিল।