সিলেটটুডে ডেস্ক | ২০ মে, ২০২৬
চা শ্রমিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে বুধবার ঐতিহাসিক ২০ মে কে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে উদযাপন করা হয়।
চা শ্রমিক কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে বুধবার সকালে মালনীছড়া চা বাগানে মিছিল-সমাবেশ এবং অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এছাড়া সিলেটের লাক্কাতুরা, হিলুয়াছড়া, দলদলি, কালাগুল,বুরজান,লালাখালসহ বিভিন্ন বাগানে মিছিল, সমাবেশ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
কেন্দ্রীয় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, চা শ্রমিক ঐক্য এর উপদেষ্টা ও বাসদ (মার্কসবাদী) সিলেট জেলার সমন্বয়ক সঞ্জয় কান্ত দাস, চা শ্রমিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অজিত রায় বাড়াইক, সাধারণ সম্পাদক বচন কালোয়ার, সাংগঠনিক সম্পাদক অধীর বাউরী, দপ্তর সম্পাদক চম্পক বাউরী, অর্থ সম্পাদক নমিতা রায়। এছাড়া বিভিন্ন চা বাগানে বক্তব্য রাখেন, চা শ্রমিক ঐক্য কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক রবি মাল, সদস্য সুহেল বুনার্জী, লিপি গঞ্জু, চঞ্চল বাক্তি,মঙ্গল কর্মকার, দলদলি চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি মিন্টু দাস, কালাগুল চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি রঞ্জু নায়েক, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ রেলি, সোহাগ ছত্রী, বুরজান বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি রতিলাল নায়েক, অক্ষয় নায়েক, সাইদুর রহমান সুহেল প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, "আজ থেকে ১০৫ বছর আগে চা শ্রমিকরা সৃষ্টি করেছিলেন এক সংগ্রামী ইতিহাস। ব্রিটিশ সরকার ও মালিকদের অত্যচার, নির্যাতন ও শোষনের বিরুদ্ধে তারা ঘোষণা করেছিলেন এক রক্তস্নাত বিদ্রোহ। পন্ডিত গঙ্গাদয়াল দীক্ষিত ও দেওশরনের নেতৃত্বে হাজার চা শ্রমিক বাগান ‘বয়কট’ করে ফিরে যেতে চান ‘নিজ মুল্লুকে’। শত শত মাইল পথ পায়ে হেটে ১৯২১ সালে ২০ মে তারা পৌঁছান চাঁদপুর স্টীমার ঘাটে। সেখানে সরকার ও মালিকদের নির্দেশে নিরস্ত্র শ্রমিকদের উপর গুলি চালায় ভয়ংকর গুর্খা বাহিনী। মেঘনাঘাট রঞ্জিত হয় শ্রমিকের রক্তে। নিহত হন হাজার হাজার চা শ্রমিক। মৃত শ্রমিকদের পেট কেটে ফেলে দেয়া হয় মেঘনা নদীতে। গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় আন্দোলনের নেতা গঙ্গাদয়াল দীক্ষিতসহ বহু শ্রমিককে। কারাগারে অত্যাচারের প্রতিবাদে প্রতিবাদে অনশন করে আত্মাহুতি দেন গঙ্গাদয়াল দীক্ষিত। চা শ্রমিকদের এই আত্মত্যাগে জেগে ওঠে সম্পূর্ণ ভারতবর্ষ। চা শ্রমিকদের এই বিদ্রোহ সারা দুনিয়ায় পরিচিত হয়েছে “চরগুলা এক্সডাগ” নামে।
কিন্তু আজ ক’জন জানি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চা শ্রমিকদের এই বীরত্বের কথা? ঐতিহাসিক ২০মে’কে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সবেতন ছুটি ঘোষণা কর। এই ইতিহাসকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তভুক্ত করার দাবি করছি।
বক্তারা আরও বলেন, গত ২বছর ধরে দেশে নানামুখী গণতান্ত্রিক সংস্কারের আলাপ-আলোচনা চলছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষষ চা শ্রমিকদের ভাগ্যের চুল পরিমাণ কোন পরিবর্তন হয়নি। উল্টো আমরা দেখতে পাই চা বোর্ডের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন চা শ্রমিকরা নাকি কাজে ফাঁকি দেন, দিনে মাত্র ৩/৪ ঘন্টা কাজ করেন। তিনি বলেন চা শ্রমিকরা ভাল আছে। আমরা তার এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাই। প্রতিদিন অস্বাভাবিক মাত্রায় জিনিস পত্রের দাম বাড়ছে। সেখানে মাত্র ১৮৭টাকা মজুরি দিয়ে কি করে ভালো থাকা যায়? এই মজুরি দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। তাই চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৬'শ টাকা নির্ধারণ করা জরুরি। একই সাথে ২০২৩ সালে প্রণীত চা শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ‘গেজেট-২৩’ বাতিল করে চা শ্রমিকদের ৬ টাকা মজুরিসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার জোড় দাবি জানাচ্ছি।
চা বাগান লোকসান হচ্ছে-এই অজুহাত তুলে চা বাগানে বিভিন্ন প্রজেক্ট চালুর পায়তায় করছে মালিক ও বর্তমান সরকার এমন দাবি করে বক্তারা আরও বলেন, অতিরিক্ত লাভের আশায় মালিক ও সরকার মিলে বিভিন্ন বাগানে খামার, রিসোর্ট ব্যবসা, টি-ট্্ুযরিজম, রাবারসহ বিভিন্ন প্রকল্প চালু করতে চাইছে। উন্নয়ন আর লাভের কথা বলে এ সকল প্রজেক্ট চালু হলে সবচেয়ে বেশি সংকটে পরবে চা শ্রমিকরা। চা শ্রমিকের স্বার্থ বিরোধী এই সর্বনাশা প্রজেক্ট চালু বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় চলে এসেছে। প্রায় ১৮৫ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় চা বাগানে বসবাসের পরও ভূমির উপর কোন আইনি অধিকার নেই আমাদের। ২০২২সালে আন্দোলনের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মৌখিকভাবে চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। বর্তমান সংসদেও এক/দুই বার এ আলোচনা উঠেছে। আমার প্রায় ২০ বছর ধরে ভূমি অধিকারের দাবিতে লড়ছি। সরকারের কাছে চা শ্রমিকদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবি করছি। শিক্ষা চিকিৎসায়ও পিছিয়ে আসেন চা শ্রমিকরা। এমবিবিএস ডাক্তার তো দূরের কথা বাগানগুলোতে নেই প্রশিক্ষিত সেবিকা বা মিডওয়াইফ। মেডিকেল সেন্টারগুলিতে সর্বরোগের ঔষধ প্যারাসিটামল।
সিলেটের ২৩টি চা বাগানের কোনটিতেই নেই সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়। খুব অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী যারা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে, তারাও শিক্ষা শেষে কাজ পায় না। দীর্ঘদিন ধরেই আমরা চা বাগানের শিক্ষিত ছাত্র-যুবাদের চা বাগানের বিভিন্ন পদে নিয়োগের দাবি করে আসছি। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যে বন্ধ হতে বসেছে বহু বাগান। সরকারি তত্ত্বাবধানে এ সকল বন্ধ ও রুগ্ন সকল বাগান চালু করা জরুরি।