মুজাহিদ সর্দার তালহা, দিরাই | ২২ মে, ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বিভিন্ন পশুর হাটে দেশি-বিদেশি জাতের গরু ও ছাগলের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। হাটজুড়ে সারি সারি পশু, বিক্রেতাদের হাঁকডাক আর দরদামের দৃশ্য থাকলেও প্রত্যাশিত ক্রেতা না থাকায় জমে ওঠেনি বেচাকেনা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মৌসুমে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ধান জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঈদকেন্দ্রিক পশুর বাজারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দিরাই উপজেলার পৌর শহরের হেলিপ্যাড মাঠ, শ্যামারচর ও আকিল শাহ বাজার এলাকায় বসা পশুর হাটগুলোতে প্রচুর গরু-ছাগল আনা হয়েছে। ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের নানা জাতের পশু থাকলেও ক্রেতাদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। অনেকেই হাটে ঘুরে পশু দেখছেন, দরদামও করছেন, তবে শেষ পর্যন্ত ক্রয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে বিক্রেতাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
হেলিপ্যাড মাঠের গরুর হাটে কথা হয় বিক্রেতা মো. জুয়েল মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, চারটি গরু হাটে এনেছি। সকাল থেকে বসে আছি, এখন পর্যন্ত মাত্র একটি বিক্রি করতে পেরেছি। ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গ্রামের মানুষের হাতে টাকা নেই। কৃষকরা এবার খুব কষ্টে আছেন। তাই বাজারে ক্রেতাও কম।
একই হাটের আরেক বিক্রেতা আব্দুল লতিফ বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর মান অনেক ভালো। খাবার ও পরিচর্যায়ও খরচ বেশি হয়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী দাম পাচ্ছি না। অনেকে এসে ১৫-২০ হাজার টাকা কমাতে চান। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
হেলিপ্যাড মাঠের হাটের ইজারাদার ইমরান মিয়া জানান, এ বছর পৌরসভার কাছ থেকে গতবারের চেয়ে বেশি টাকায় হাট ইজারা নিতে হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশানুরূপ বেচাকেনা না হওয়ায় লোকসানের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই দুশ্চিন্তা বাড়ছে। হাটে পশু আছে, কিন্তু ক্রেতার সাড়া কম। শেষ মুহূর্তে বিক্রি বাড়বে এমন আশাতেই আছি।
দিরাই পৌরসভার দায়িত্বশীল আরব আলী বলেন, পৌর এলাকায় এবার একটি প্রধান পশুর হাট বসেছে। হাটটি প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ৮ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। ভ্যাটসহ ১০ লাখ ১০ হাজার টাকা। পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করা হচ্ছে।
হাটে পশু কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, ছাগল কিনতে এসেছি, কিন্তু বিক্রেতারা তুলনামূলক বেশি দাম চাইছেন। আমাদের আয় তো বাড়েনি, বরং সংসারের খরচ বেড়েছে। ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে ভালো মানের ছাগল পেলে কিনতাম, কিন্তু সে দামে পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খামারিরা বলছেন, হাওরাঞ্চলে ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রতিবছর বোরো মৌসুমের আয় দিয়েই অনেক পরিবার ঈদ উপলক্ষে পশু কেনার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু এবার সেই সক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে উপজেলায় ৩টি পশুর হাট বসেছে। হাটগুলোতে নিরাপত্তা ও সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্রেতা- বিক্রেতারা যেন স্বচ্ছভাবে বেচাকেনা করতে পারেন, সে বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয় বলে মনে করছেন অনেক বিক্রেতা। তাঁদের আশা, ঈদের আগের দুই-তিন দিনে ক্রেতার চাপ বাড়বে এবং তখন বিক্রিও জমে উঠবে।
হেলিপ্যাড মাঠের কয়েকজন বিক্রেতা জানান, প্রতি বছরই ঈদের শেষ মুহূর্তে হাটে বেশি ভিড় হয়। এবারও সেই প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, শেষ দুই দিন যদি ভালো বিক্রি হয়, তাহলে অন্তত লোকসান থেকে বাঁচা যাবে।
সব মিলিয়ে, দিরাইয়ের পশুর হাটে এবার পশুর সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও হাওরের ধানহানির প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির চাপে বেচাকেনার গতি অনেকটাই মন্থর হয়ে পড়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে বাজার পরিস্থিতির উন্নতির আশায় রয়েছেন ব্যবসায়ী ও খামারিরা।