নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৯ জুন, ২০২৬
সিলেটে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। সিলেটে হামে এ পর্যন্ত ৬৭ জন মারা গেছেন। আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ২৫৭ জন।
হামের এই মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে এবার চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই সিলেটে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। চলতি বছরে সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (৯ জুন) স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
এদিকে, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে অধ্যাবধি মোট ২৩ জন রোগী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা মোট ৩ জন। তারমধ্যে সিলেট নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ জন এবং হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন।
শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে সিলেট জেলায় মোট রোগী ৩ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় মোট রোগী ৬ জন, হবিগঞ্জ জেলায় মোট রোগী ১৩ জন এবং বাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে মৌলভীবাজার জেলায় কোনো রোগী নেই বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, নাগরিক অসচেতনতা ও মশা নিধনে গাফিলতি এই তিন মিলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, এখনই যদি আমরা সকলে মিলে সচেতন না হই, তাহলে ডেঙ্গু শীতকালেও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, মশারি ব্যবহার এবং চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা এখনই এসব অভ্যাসে মনোযোগ না দিলে সামনে শঙ্কা আরও বাড়বে।
সিলেটে খোলা হয়েছে ডেঙ্গু কর্নার
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। তবে আক্রান্ত কোনও রোগী নেই।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রশিদ মুনির বলেন, ‘শনিবার সিলেটে ডেঙ্গু সচেতনতায় র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাসপাতালের নতুন ভবনে ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে। এতে ২০টি শয্যা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে কোনও রোগীর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি। আমাদের প্রস্তুতি আছি।’
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিসিকের র্যালি
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে নগরীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে নগরভবন প্রাঙ্গণ থেকে র্যালিটি বের হয়। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী র্যালিতে নেতৃত্ব দেন।
র্যালিটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে পুনরায় নগরভবনে এসে শেষ হয়।
র্যালি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “আমরা একটি ডেঙ্গুমুক্ত নগরী গড়ে তুলতে চাই। সে লক্ষ্যেই ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম শুরু করেছি। এখন মৌসুম শুরু হয়েছে, তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। নিজেদের আঙিনা, বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।”
তিনি বলেন, “অতীতেও সিলেটে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সবাই সচেতন থাকলে এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করলে এবারও আমরা নগরবাসীকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম হব।”
সিসিক প্রশাসক আরও বলেন, “এখন পর্যন্ত নগরীতে কোনো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে আক্রান্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে আমরা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছি। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম চালানো হবে। মসজিদের জুমার খুতবায়ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতামূলক বার্তা তুলে ধরার অনুরোধ জানানো হবে।”
মশক নিধন কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, “সিটি কর্পোরেশনের নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আগামী মাস থেকে প্রতিটি বাসাবাড়িতে গিয়ে এডিস মশার লার্ভা রয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা হবে। কোথাও লার্ভা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে এর উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা হবে।”
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, “নগরবাসী অত্যন্ত দায়িত্বশীল। বিভিন্ন জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে আমরা তাদের সহযোগিতা পেয়েছি। তাই প্রাথমিকভাবে কোথাও এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং সচেতনতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হবে। বাসাবাড়িতে যাতে পানি জমে না থাকে সে বিষয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি বাড়িতে লার্ভা নিধনের ওষুধ নিয়ে যাওয়া হবে। কোথাও লার্ভা পাওয়া গেলে তা স্প্রে করে ধ্বংস করা হবে। সবাই সচেতনভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ অনেক সহজ হবে।”
সিসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “পূর্বের বছরের মতো এবারও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। হাসপাতালগুলোতে সিসিকের পৃথক সার্ভিল্যান্স টিম কাজ করবে। কোনো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলে কুইক রেসপন্স টিম তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির বাসা বা সংশ্লিষ্ট এলাকার আশপাশের অন্তত ২০টি বাড়িতে অনুসন্ধান চালাবে এবং এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে তা ধ্বংস করবে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নগরবাসীর সচেতনতা এবং সিটি কর্পোরেশনের গৃহীত কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে অতীতের মতো এ বছরও সিলেটকে ডেঙ্গুমুক্ত রাখা সম্ভব হবে।
র্যালিতে সিসিকের সচিব মো. আশিক নূর, প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) একলিম আবদীনসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন।