Sylhet Today 24 PRINT

সিলেটের সেই ‘ব্রাজিল বাড়ি’ আবারও আলোচনায়

জীবন পাল  |  ১৮ জুন, ২০২৬

সিলেট নগরের মাছিমপুর এলাকায় ঢুকতেই দূর থেকে চোখে পড়ে সবুজ-হলুদে মোড়া একটি বাড়ি। দেয়াল, বারান্দা, টিনের ছাউনি, এমনকি পাশের দোকানের শাটারেও একই রঙের ছোঁয়া। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, যেন বাংলাদেশের কোনো পাড়ায় নয়, ব্রাজিলের কোনো অলিগলিতে এসে দাঁড়িয়েছেন।

স্থানীয়দের কাছে বাড়িটির পরিচয় এখন একটাই ‘ব্রাজিল বাড়ি’।

২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বাড়িটির এমন রূপান্তর। এবার বিশ্বকাপের মৌসুমে আবারও আলোচনায় এসেছে সেই বাড়ি।

পরিবারের সদস্যদের অধিকাংশই ব্রাজিলের সমর্থক। প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেই পুরো বাড়ি ব্রাজিলের পতাকার আদলে রাঙিয়ে তোলেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয় এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে এলাকার অনেকেই এখন বাড়িটির প্রকৃত মালিকের নাম জানেন না, চেনেন শুধু ‘ব্রাজিল বাড়ি’ হিসেবে।

মাছিমপুরের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘২০২২ বিশ্বকাপের সময় বাড়িটা এভাবে রং করা হয়। যারা করেছেন, তাঁরা সবাই ব্রাজিলের সমর্থক। তখন থেকেই মানুষ এটাকে ব্রাজিল বাড়ি নামে ডাকতে শুরু করে। এখন দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে দেখতে আসে।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘আমি নিজে আর্জেন্টিনার সমর্থক। কিন্তু সত্যি বলতে কী, পুরো এলাকার পরিচিতি বেড়েছে এই বাড়ির কারণে। কেউ আগে ভাবেনি, একটি বাড়িকে এমনভাবে সাজানো যায়।’

বাড়িটির অন্যতম সদস্য সাজ্জাদুর রহমান টিপু জানান, পরিবারের প্রায় সবাই ব্রাজিল সমর্থক। সেই আবেগ থেকেই বাড়ির প্রতিটি অংশ ব্রাজিলের পতাকার রঙে সাজানো হয়েছে।

‘আমরা ব্রাজিলের সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং থাকব। ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজি—অধিকাংশই ব্রাজিল সমর্থক। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েই বাড়িটি রং করেছি,’ বলেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, বাড়িটি সাজাতে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিল। তবে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করলেও দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা ভুলে যাননি। তাই বাড়ির নকশায় বাংলাদেশের পতাকার প্রতীকও রাখা হয়েছে।

টিপু বলেন, ‘অনেক জায়গা থেকে মানুষ আসে। ছবি তোলে, ভিডিও করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দেয়। বিষয়টি আমাদের ভালোই লাগে।’
বাড়িটির সবচেয়ে ছোট ভক্তদের একজন রায়ান। বয়স কম হলেও সে জানে, তাদের বাড়িটি কেন এমন রঙিন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বসে খেলা দেখে সে-ও নিজেকে ব্রাজিল সমর্থক বলে পরিচয় দেয়।

স্থানীয় মুদি দোকানদার মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়িটি আমাদের এলাকার জন্য আনন্দের বিষয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ দেখতে আসে। ছবি তোলে। এতে এলাকার পরিচিতিও বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এখানে ভিন্ন দলের সমর্থক আছে। কিন্তু খেলা এলেই সবাই একসঙ্গে বসে খেলা দেখে। এটাই সবচেয়ে সুন্দর বিষয়।’

মজার ব্যাপার হলো, বাড়িটির প্রশংসা করছেন আর্জেন্টিনা সমর্থকেরাও। স্থানীয় এক তরুণ বলেন, ‘হার-জিত বড় কথা নয়। একজন সমর্থক তাঁর দলের প্রতি কতটা ভালোবাসা রাখেন, এই বাড়ি তার উদাহরণ। আমরা আর্জেন্টিনার সমর্থক হলেও বাড়িটা নিয়ে গর্ব করি।’

পাশের স্কুলপড়ুয়া শিশুদের কাছেও বাড়িটির পরিচয় একটাই—‘ব্রাজিল বাড়ি’। তাদের অনেকেই ব্রাজিলের জার্সি পরে খেলাধুলা করে। কেউ কেউ কাঁধে ছোট্ট ব্রাজিলের পতাকা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

চার বছর আগে বিশ্বকাপের উন্মাদনায় রঙ করা হয়েছিল বাড়িটি। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, বিশ্বকাপ এসেছে-গেছে, প্রিয় দল জিতেছে-হেরেছে। কিন্তু মাছিমপুরের এই বাড়ির রঙ এখনো মুছে যায়নি। বরং ব্রাজিলের প্রতি এক পরিবারের ভালোবাসা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিচয়।

এখন কেউ ঠিকানা খুঁজতে এলে স্থানীয়রা রাস্তার নামের আগে বলে দেন, ‘ব্রাজিল বাড়ির কাছে আসেন।’ ফুটবলের প্রতি আবেগ থেকে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগ এভাবেই একটি বাড়িকে পরিণত করেছে এলাকার ল্যান্ডমার্কে। মাছিমপুরে তাই ব্রাজিল শুধু একটি দলের নাম নয়, একটি বাড়ির রঙে আঁকা এক টুকরো পরিচয়ও।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.