Sylhet Today 24 PRINT

জৈন্তার রাজবাড়িতে মেলা নিয়ে বিতর্ক, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চিঠি

জৈন্তাপুর প্রতিনিধি |  ১৮ জুন, ২০২৬

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ঐতিহাসিক ও সংরক্ষিত পুরাকীর্তি জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী ‘শিল্প ও পণ্য মেলা’ আয়োজনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় মেলাটি বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়।

বুধবার (১৭ জুন) আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোছা. নাহিদ সুলতানা স্বাক্ষরিত এক পত্রে উল্লেখ করা হয়, জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ি বাংলাদেশ সরকারের তথা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। ১৯৮৪ সালের ২২ এপ্রিল বাংলাদেশ গেজেটের মাধ্যমে এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

পত্রে বলা হয়, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সিলেট কর্তৃক আদিবাসী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা, সিলেটকে জৈন্তাপুর উপজেলার ইরাবতী মাঠে (জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ির মাঠ) মাসব্যাপী ‘শিল্প ও পণ্য মেলা-২০২৬’ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মেলার সামগ্রী বহনকারী ট্রাক রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় প্রধান গেটের ক্ষতিসাধনের ঘটনাও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতে, Antiquities Act, 1968 (সংশোধিত ১৯৭৬)-এর ১২(৩)(গ) ও ১৯(১) ধারা অনুযায়ী সংরক্ষিত পুরাকীর্তির নিকটে কোনো ধরনের নির্মাণকাজ, সৌন্দর্যহানি কিংবা ক্ষতিসাধন আইন পরিপন্থি। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ ও ২৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণের চেতনারও পরিপন্থি।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ি প্রাঙ্গণের ভূগর্ভে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান রয়েছে। ফলে প্রত্নস্থলের অভ্যন্তরে মেলা, সভা, সমাবেশ কিংবা বৃহৎ জনসমাগমমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হলে প্রত্নসম্পদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এতে ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও নান্দনিক মূল্য ক্ষুণ্ণ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে জৈন্তাশ্বর রাজবাড়িতে অবস্থিত প্রাচীন মেগালিথিক সমাধিগুলোর রাসায়নিক সংরক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রত্নস্থলের প্রাচীন সীমানা প্রাচীর সংস্কার করা হয়। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও জরিপের মাধ্যমে জৈন্তাপুর অঞ্চলে নতুন নতুন প্রত্নস্থল শনাক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এলাকাটিকে পর্যটনবান্ধব করে টিকিটিং ব্যবস্থা চালুসহ স্থায়ী অফিস স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এদিকে, ঐতিহাসিক এই প্রত্নস্থলে মেলা আয়োজনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সচেতন মহলও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও গবেষকরা বলেন, “জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ি শুধু একটি প্রত্নস্থল নয়, এটি জৈন্তা রাজ্যের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এখানে বাণিজ্যিক মেলা বা বড় ধরনের জনসমাগম প্রত্নসম্পদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত ঐতিহ্যবাহী এই স্থানের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।”

সচেতন নাগরিকদের মতে, সংরক্ষিত প্রত্নস্থলে এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতে প্রত্নসম্পদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই জৈন্তাশ্বর রাজবাড়িসহ জৈন্তাপুর উপজেলার অন্যান্য প্রত্নস্থলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্থায়ী নীতিমালা ও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চিঠিতে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি জৈন্তাশ্বর রাজবাড়িসহ জৈন্তাপুর উপজেলার অন্যান্য প্রত্নস্থলের সুরক্ষা ও সংরক্ষণের স্বার্থে ভবিষ্যতে সেখানে কোনো ধরনের মেলা, সভা, সমাবেশ কিংবা অনুরূপ জনসমাগমমূলক কার্যক্রম বন্ধে জেলা প্রশাসক, সিলেটকে জরুরি ভিত্তিতে পত্র দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.