Sylhet Today 24 PRINT

শাহজালাল-শাহপরানের দরগাহে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে ৬৭ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২১ জুন, ২০২৬

আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত পুণ্যভূমি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শরিফ প্রাঙ্গণে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক পুলিশি উপস্থিতিতে নতুন দানবাক্স স্থাপন ও পূর্বের ডেগ ও দানবাক্স সিলগালা করার আকস্মিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশে-বিদেশে ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

রোববার (২১ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপকে ঐতিহ্য ও মাজার সংস্কৃতি-বিরোধী আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ বলেন, শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ও স্বাধিকারী এই দরগাহে এ ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ স্বাধীন বাংলাদেশে অতীতে কখনো দেখা যায়নি। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, মাজারের দান-খয়রাত ও মানতের অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক—তা সবারই কাম্য। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি এখতিয়ার বা আদালতের নির্দেশনা ছাড়া, প্রশাসন কর্তৃক যে প্রক্রিয়ায় দরগাহর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, তাতে সিলেটের সর্বস্তরের সচেতন জনসাধারণ গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। এই ঘটনা দরগাহ ও মাজার সংস্কৃতি-বিরোধী একটি বিশেষ মহলের দীর্ঘদিনের অভিসন্ধি পূরণের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা জনমনে তীব্র সংশয় ও আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

সুফিবাদের মূল দর্শন স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁরা বলেন, আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে, পীর-আউলিয়াদের মাজার স্রেফ কোনো ইট-পাথরের কাঠামো কিংবা ওখানে থাকা দানবাক্স কিংবা ডেগ স্রেফ টাকা জমার উপকরণ নয়; এগুলো মূলত সুফি-সাধকদের মরমি প্রেমের পবিত্র আঙিনায় আত্মিক আশ্রয়ের জন্যে আসা মানুষের নিঃশর্ত নিবেদন ও ভালোবাসা। যা কোনো জাগতিক পরিমাপ বা টাকার অঙ্কে মাপা অসম্ভব। সুফিবাদের এই নিঃশর্ত প্রেম ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার আমাদের সংস্কৃতির এবং আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, যে কঠোর ও সামরিক কায়দায় এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা সিলেটের শতাব্দীপ্রাচীন সৌহার্দ্যপূর্ণ ঐতিহ্য, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভূতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সংঘাতপূর্ণ। যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং সামাজিক মূল্যবোধ ও সম্প্রীতির বিষয়গুলো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যা এই ঘটনার ক্ষেত্রে চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।

সিলেটের অভিভাবকত্ব ও সামাজিক শিষ্টাচারের কথা উল্লেখ করে নাগরিক সমাজ বলেন, সিলেট কোনো অভিভাবকহীন জনপদ নয়। এ অঞ্চলের রয়েছে নিজস্ব সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস, মরমি লোকাচার ও সুফি সংস্কৃতির চর্চা এই অঞ্চলের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অতএব, দরগাহর স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, দরগাহর কর্তৃপক্ষ, সুফিবাদী আলেম-উলামা-বিশেষজ্ঞগণ, সুশীল সমাজ এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও ঐকমত্যে পৌঁছানো ন্যূনতম শিষ্টাচারের অংশ ছিল। এক্ষেত্রে এটা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাঁরা আরও বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা যেমন জরুরি, তেমনি তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটিও হতে হবে আইনসম্মত, অংশগ্রহণমূলক এবং জনআস্থাভিত্তিক। বন্দুকের পাহারায় মানুষের বিশ্বাস ও সংবেদনশীল অনুভূতিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আঘাত করে কোনো শুভ বা মহৎ উদ্যোগও কখনো কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে না।

তাঁরা বলেন, পীর-আউলিয়াদের দরগাহ পর্যটন কেন্দ্র নয়, সুফি সংস্কৃতিতেই দরগা পরিচালিত হয়। তাই দরগা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ৭০০ বছর ধরে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ফলে দরগা নিয়ে সংবেদনশীল পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সামাজিক ঐকমত্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সিলেটের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার আমাদের সবার যৌথ সম্পদ; তা রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে নাগরিক সমাজের এ প্রতিনিধিরা বলেন, আমরা সিলেটের সম্মানিত জনপ্রতিনিধিবৃন্দ, জেলা প্রশাসন, দরগাহ কর্তৃপক্ষ এবং নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানাই—যৌথ আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতির একটি সম্মানজনক, গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধান বের করে করতে হবে। ঐতিহ্য রক্ষা, আইনের শাসন এবং জনআস্থা—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই হওয়া উচিত এই মুহূর্তের প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা অবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী দরগাহ শরিফ থেকে প্রশাসনের বাক্স, তালা, পুলিশি বেষ্টনী প্রত্যাহার এবং এই উদ্ভূত সংকটে সিলেট অঞ্চলের সকল জনপ্রতিনিধিসহ সরকারের সর্বোচ্চ মহলের আশু ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ হলেন: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, বিশিষ্ট নেফ্রোলজিস্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর এমিরেটাস ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী তবারক হোসেন, সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবরুল হোসেন বাবুল, সাবেক অতিরিক্ত এআইজি বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ বজলুল করিম বিপিএম, প্রবীণ রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য, প্রবাসী সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক উদ্দিন চৌধুরী রানা, প্রকৌশলী হাবিব আহসান বাবলু, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল, স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন, নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর আব্দুল্লাহ খোন্দকার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হ্যারল্ড রশীদ।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরীন আক্তার ও সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, ধরা সিলেটের আহ্বায়ক ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী (বাহার), ডা. নাসিম আহমদ, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মো. তারেক আজাদ, সাকী চৌধুরী, জুবায়ের আহমদ চৌধুরী (সিলেট বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন), আনোয়ার হোসেন চৌধুরী (জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা), বদরুল হোসেন খান (জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা), অধ্যাপক রানা ফেরদৌস, জুয়েল চৌধুরী, মুহিবুর রহমান মুহিব (গ্লোবাল জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন), ময়নুল হক চৌধুরী হেলাল, আতাউর রহমান সেলিম (বাংলাদেশ সোসাইটি নিউইয়র্ক), নিসর্গবিদ স্থপতি তুগলক আজাদ, নাজমুল হক (আইডিয়া), বজলে মোস্তফা রাজী (এফআইভিডিবি)।

শাবিপ্রবির অধ্যাপক ড. নাজিয়া চৌধুরী, অধ্যাপক ড. এম এ জি এ হায়দার, সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ এমদাদুল হক ও সঞ্জয় কৃষ্ণ বিশ্বাস; লিডিং ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. এম আশরাফুল আল হক, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে-এর সদস্য ড. আনিছুর রহমান আনিছ, প্রাক্তন রোটারি গভর্নর রোটারিয়ান শহীদ আহমদ চৌধুরী, সিপিবি নেতা অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন সুমন, সৈয়দ ফরহাদ হোসেন ও খায়রুল হাসান; বাংলাদেশ জাসদের অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ ও নাজাত কবির; বাসদ-এর আবু জাফর ও প্রণব জ্যোতি পাল; বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সিরাজ আহমদ; সাম্যবাদী আন্দোলনের অ্যাডভোকেট মহীতোষ দেব মলয়; বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সঞ্জয় কান্ত দাস; সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের জুবায়ের আহমদ চৌধুরী সুমন এবং চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নাজিকুল ইসলাম রানা।

এছাড়াও স্বাক্ষর করেছেন প্রবাসী ব্যবসায়ী ফকু চৌধুরী, সম্মিলিত নাট্য পরিষদের প্রধান পরিচালক শামসুল বাছিত শেরো, যুক্তরাজ্যের পূর্বরাগ থিয়েটারের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর মুরাদ খান, প্রবাসী লেখিকা জেসমিন চৌধুরী, প্রবাসী শিল্পী আমির মোহাম্মদ, পরিবেশবাদী সংগঠন অমরাবতীর চেয়ারম্যান সেবুল চৌধুরী, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হাসিনা বেগম ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছামির মাহমুদ, লেখক ও প্রকাশক কবির য়াহমদ, প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক সৈয়দ উদবা ও মাহবুব রহমান, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সদস্য সৈয়দ জয়নুল শামস, সিলেট ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সভাপতি আ ন ম জিয়া, যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক ও কবি হামিদ মোহাম্মদ, ব্রিকলেন নিউজডটকম-এর সম্পাদক জুয়েল রাজ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গোলাম সোবহান চৌধুরী ও ব্যারিষ্টার সীমা করিম এবং সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল করিম কিম।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.