Sylhet Today 24 PRINT

মাজারের স্বচ্ছতা: মুক্তাদিরের কমিটিতে নেই আরিফ

নিজস্ব প্রতিবেদক |  ২৬ জুন, ২০২৬

সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা স্থান পেলেও, নাম নেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী, সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর।

এ নিয়ে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

জানা গেছে, গত বুধবার মালয়েশিয়া সফর শেষে সিলেটে এসে মাজার সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, “এ ব্যাপারে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে আমাদের কথা হয়েছে। আমরাও মাজারে স্বচ্ছতা আনতে চাই। শীঘ্রই এ ব্যাপারে সিলেটের সকল এমপি, জনপ্রতিনিধিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বৈঠক করে মাজারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

আরিফুল হকের এমন বক্তব্যের মাত্র দুদিন পরই শুক্রবার সকালে সিলেটের সার্কিট হাউজে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সেই বৈঠকেই মাজারের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা আনার প্রক্রিয়া ঠিক করতে ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি ‘যৌক্তিক পদ্ধতি’ নির্ধারণ করবে।

দীর্ঘদিনের মেয়র এবং অতীতে মাজারের বিভিন্ন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আরিফুল হক চৌধুরীকে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করায় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কমিটিতে আরিফুল হক চৌধুরীকে না রাখার সমালোচনা করে সাংবাদিক মাসুদ আহমদ রনি ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, “হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার কোনো সংসদীয় আসনের বিষয় নয়, কোনো রাজনৈতিক বলয়ের সম্পদও নয়। এটি সিলেটের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং জাতির আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ। তবুও মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় গঠিত ১২ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে স্থান হয়নি সিলেটের দুইবারের নির্বাচিত সাবেক মেয়র, বর্তমান সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর। প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি নীতি, প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তিকে ঘিরে। যে মাজার কোনো সংসদীয় আসনের বিষয়ই নয়, সেই মাজারের ব্যবস্থাপনায় সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধির জন্যও যদি জায়গা না হয়, তাহলে সেই কমিটির প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় অংশীজনদের উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্তকে ‘স্বচ্ছতা’ বলা সহজ, কিন্তু জনমতের আদালতে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা ততটা সহজ নয়।”

ঘোষিত ১২ সদস্যের কমিটিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ছাড়াও অন্য সদস্যরা হলেন—সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেটের ডিআইজি এবং মহানগর পুলিশ কমিশনার। এছাড়া মাজারের মোতোয়াল্লি পরিবারের দুজন সদস্য এবং মাজার মাদ্রাসা ও মসজিদের দুজন প্রতিনিধি কমিটিতে থাকছেন। এই কমিটির সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি)।

কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, দরগাহর উন্নয়ন ও দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতা আনতে মাজার কর্তৃপক্ষসহ সকলেই একমত হয়েছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখাই প্রধান লক্ষ্য জানিয়ে তিনি বলেন, আপাতত বিদ্যমান কমিটি নিয়ম অনুযায়ী দানের টাকা গণনা করবে এবং তা চলমান ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে।

বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের উদ্যোগ ও মাজারের দানবাক্স সিলগালা করা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “আমরা পেছনের ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। সামনে এগিয়ে যেতে চাই। তবে কাজ করার দুটি পদ্ধতি আছে। একটি হলো—কাজ করা, আর আরেকটি হলো—সবাইকে নিয়ে কাজ করা। যাতে সবার অংশগ্রহণ থাকে, কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়। আমরা সেরকম উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে স্বচ্ছতাও আসবে, সবার অংশগ্রহণও থাকবে।”

প্রসঙ্গ উল্লেখ্য, গত ১২ জুন তৎকালীন ডিসি সারওয়ার আলম হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন মাজারে নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন এবং ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ ও একটি দানবাক্স সিলগালা করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসকের পক্ষে-বিপক্ষে সিলেটে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দেশ-বিদেশের ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক জেলা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে মাজার-সংস্কৃতি বিরোধী যেকোনো কিছু থেকে সরে আসার আহ্বান জানান জেলা প্রশাসনকে।

এই বিতর্কের মধ্যেই গত রোববার বিকেলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে। এর প্রতিবাদে এবং ডিসিকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করে। প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন সোমবার (২২ জুন) বেলা দুইটায় বিদায়ী ডিসির নির্দেশনায় দানবাক্স ও সিলগালা করা ডেগগুলো খোলা হয়। গণনা শেষে দেখা যায়, আটটি ডেগ ও দানবাক্সে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা নগদ, ৭ আনা স্বর্ণালংকার ও ১০ সৌদি রিয়াল পাওয়া গেছে। এই অর্থ মাজারের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয় এবং তখন থেকেই মাজারের আয়ের স্বচ্ছতার বিষয়টি মূল আলোচনায় চলে আসে। টাকা গণনাকারীরা জানান, প্রাপ্ত টাকার বেশিরভাগই ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট। বড় নোটের আধিক্যের কারণে সামাজিক মাধ্যমে এই টাকার উৎস সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.