মুজাহিদ সর্দার তালহা, দিরাই | ০২ জুলাই, ২০২৬
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল দিরাইয়ে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাজার হাজার কৃষকের ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারি সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই সহায়তা পাওয়ার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নকে কেন্দ্র করে পুরো উপজেলাজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় তালিকা তৈরিতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, অকৃষকের নাম অন্তর্ভুক্তি এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে দিরাই পৌরসভা থেকে শুরু করে করিমপুর, জগদল, তাড়ল, চরনারচর, সরমঙ্গল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় তালিকা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। কোথাও লিখিত অভিযোগ, কোথাও মানববন্ধন, আবার কোথাও উপজেলা প্রশাসনের কাছে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। এতে সরকারি সহায়তা বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ কৃষকদের মধ্যে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সরমঙ্গল ও করিমপুর ইউনিয়নে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা অভিযোগ করেন, ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, এমনকি অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামে বসবাস করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও প্রকাশ্যে তালিকা পুনঃযাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
সর্বমঙ্গল ইউনিয়নের কৃষকরা অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ বোর্ডে তালিকা অল্প সময়ের জন্য টাঙিয়ে পরে সরিয়ে ফেলা হয়। এতে সাধারণ কৃষকরা আপত্তি জানানোর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন তারা।
এর আগে দিরাই পৌরসভার প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের পরও একই ধরনের অভিযোগ ওঠে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়, প্রকৃত ক্ষুদ্র কৃষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, অন্তত কয়েকটি পরিবারের বহু সদস্য তালিকাভুক্ত হলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম বাদ পড়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু মাঠকর্মী সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতি যাচাই না করে অফিসে বসে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় তালিকা প্রস্তুত করেছেন। ফলে প্রকৃত ক্ষতির চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।
কৃষকদের ভাষ্য, যাদের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে তাদের অনেকেই তালিকার বাইরে। অন্যদিকে কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন ব্যক্তিরাও সরকারি সহায়তার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এতে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।
এখন দিরাইয়ের কৃষকদের একটাই দাবি বিতর্কিত তালিকা বাতিল করে ইউনিয়নভিত্তিক পুনঃযাচাই করতে হবে। অকৃষক ও অযোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই অনিয়ম শুধু কৃষকদের ক্ষতিই বাড়াবে না, সরকারের কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।