Sylhet Today 24 PRINT

দিগুণ টোল আদায়ের প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে চারদিন ধরে চলছে নৌ-ধর্মঘট

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি |  ০৫ জুলাই, ২০২৬

কর্মচঞ্চলতা হারিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার পাটলাই নদী। অভিযোগ উঠেছে, ওই নদীতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ঘাট দাবি করে চলন্ত নৌযান থেকে দ্বিগুণ টোল আদায় করছে নতুন ইজারাদার।

জানা গেছে, ইজারাদারি প্রতিষ্ঠান তাহিয়া স্টোন ক্রাশার এই বাড়তি টোল আদায় করছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি নাছির মিয়া।

এই ঘটনার প্রতিবাদে পাটলাই নদীতে চলছে পণ্যবাহী নৌযানের শ্রমিক ও চালকদের লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি। জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি শনিবার চতুর্থ দিনেও অব্যাহত ছিল; যার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত রুটে কয়লা ও পাথর পরিবহন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে শত শত শ্রমিক প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের পাটলাই নদীতে নৌযান নিয়ে অবস্থান করছেন।

এদিকে গুরুত্বপূর্ণ নৌপরিহন কাজে স্থবিরতা চলমান থাকলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কোনো পক্ষই এগিয়ে আসেনি। এমনটাই অভিযোগ ক্ষুব্ধ নৌশ্রমিকদের। তারা জানান, শনিবার বিকেল পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি তাদের খোঁজ নেননি। সমস্যা সমাধানে দায়িত্বশীলদের অনাগ্রহের ব্যাপারে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।


এদিকে কর্মসূচিতে থাকা নৌযানের সংশ্লিষ্টরা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত নৌ-শ্রমিকরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ইজারাদারের লোকজন চলন্ত নৌযান থামিয়ে জোরপূর্বক টোল আদায় করেছে। বিগত সরকারের আমল থেকেই এই অনিয়ম চলে আসছে। পটপরিবর্তনের পর এই জুলুম বন্ধ হবে আশা করলেও হয়েছে উল্টো। টোলের হার দ্বিগুণ করে উল্টো রক্ষকই ভক্ষক হয়ে উঠেছে।

নৌশ্রমিকরা জানান, ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতি টন কয়লা ও পাথর পরিবহনে ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা হারে টোল নেওয়া হতো। কিন্তু কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই নতুন ইজারাদার প্রতিষ্ঠান তাহিয়া স্টোন ক্রাশার প্রতি টনে ৭০ টাকা টোল দাবি করছে। এতে প্রতিটি ট্রিপে অতিরিক্ত কয়েক হাজার টাকা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে তারা পণ্য পরিবহন বন্ধ রেখেছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চার দিন ধরে খোলা নদীতে আটকে থাকায় শ্রমিকদের মাঝে তীব্র খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। আশপাশের শ্রীপুর বাজারের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার হওয়ায় অনেকে ছোট নৌকা ভাড়া করে নিত্যপণ্য আনছেন, আবার অনেকেই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তীব্র গরমে স্টিলের তৈরি বাল্কহেডের ওপর থাকা শ্রমিকদের জন্য নরকযন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শ্রমিকরা বলেন, চার দিন ধরে নৌকা নিয়ে নদীতে পড়ে আছেন। এই প্রচণ্ড গরমে স্টিলের ডেক এতটাই তেতে ওঠে যে দাঁড়ানো যায় না। একটু পরপর নদীর পানি তুলে ডেকে ঢালতে হচ্ছে। এভাবে নদীতে পড়ে থাকার চেয়ে জেলখানায় থাকাও ভালো, সেখানে অন্তত সময়মতো খাবার পাওয়া যায়। খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই।

বাজিতপুরের নৌশ্রমিক হাসান অভিযোগ করেন, প্রতি টনে ৭০ টাকা দিলে বড় লোকসানে পড়তে হবে। অতিরিক্ত টোল দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মারধর করে জেটির বাথরুমে আটকে রাখা হয়। এই অত্যাচারের প্রতিবাদেই তারা ধর্মঘটে নেমেছেন।

এ বিষয়ে জানতে পাটলাই নদীর বিআইডব্লিউটিএ জেটিতে গেলে কর্মচারীরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জেটিতে দায়িত্বরত শাহীন আলম নামের এক কর্মচারী জানান, দ্বিগুণ টোলের বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই এবং কথা বলার মতো কোনো কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত নেই।

তবে ইজারাদারি প্রতিষ্ঠান তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের মালিক ও তাহিরপুরের দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি নাছির মিয়া ফোনে জানান, গত বছর ঘাটের ইজারামূল্য ছিল ৪ কোটি টাকা, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৭ কোটি টাকা। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষই টোলের হার বাড়িয়েছে। আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার বৈঠক হয়েছিল। সেখানে আগামী এক সপ্তাহ প্রতি ফুট ৫০ টাকা এবং পরে ৭০ টাকা করে টোল আদায়ের বিষয়ে তারা সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু শনিবার সকাল থেকে তারা আবারও আন্দোলন শুরু করেছেন।

এদিকে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মতিউর রহমান খান বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যমে দেখে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত বিষয়টির সমাধান করা হবে।

নৌ-ধর্মঘটের কারণে তাহিরপুরের নদীপথে কয়লা ও চুনাপাথর পরিবহন বন্ধ থাকায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত এই সংকটের সমাধান না হলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.