মো: নাজমুল ইসলাম, বড়লেখা | ০৬ জুলাই, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সাবাজপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের সাবাজপুর চা-বাগানে বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে ব্যাপক হারে গাছ কেটে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে গাছ কেটে বাগানের বাইরে বিক্রি করা হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে প্রায় ৭ শতাধিক ঘনফুট কাঠ জব্দ হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত দুই মাসে চা-বাগানের দক্ষিণাঞ্চলের বৈকুণ্ঠনগর, বিপিন টিলা, আন্ডার টিলা এবং আশপাশের বিভিন্ন টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় কয়েক শ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পাহাড়ি ঢালে থাকা বড় বড় গাছ হাতির সাহায্যে নিচে নামিয়ে ট্রাকে করে বিয়ানীবাজারের কাঠ ব্যবসায়ী মিজান উদ্দিনসহ স্থানীয় কয়েকজনের কাছে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, কাটা গাছের কাঠ প্রথমে বাগানের কার্যালয় ও কারখানার আশপাশে মজুত রাখা হতো। পরে ভোরবেলা লোকচক্ষুর আড়ালে বিভিন্ন স-মিলে পাঠানো হতো। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি লিজের জমিতে থাকা এসব গাছ কেটে বিক্রির পেছনে প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রচ্ছায়া ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, দিনের পর দিন এত বড় পরিসরে গাছ কাটার ঘটনা কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে গেল। তাঁদের অভিযোগ, বন বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন সমঝোতার কারণেই দীর্ঘদিন এ কার্যক্রম চলেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে বন বিভাগের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার (৪ জুলাই) বিকেলে বড়লেখা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাইমা নাদিয়া বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে চা-বাগান পরিদর্শন করেন। সেখানে বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ কাটা গাছ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় বাগান কর্তৃপক্ষ গাছ কাটার পক্ষে বন বিভাগ, বাংলাদেশ চা বোর্ড কিংবা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদনের কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।
পরে সহকারী কমিশনারের নির্দেশে বড়লেখা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা বাগানের কার্যালয়সংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ৫০০ ঘনফুট কাঠ জব্দ করেন। একই সঙ্গে বাগানের বিভিন্ন টিলায় পড়ে থাকা কাটা গাছের পরিমাণ নির্ধারণ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দিতে বন বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাইমা নাদিয়া বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে বিপুল পরিমাণ কাটা গাছ পাওয়া গেছে। আপাতত গাছগুলো যে অবস্থায় রয়েছে, সেভাবেই সংরক্ষণ করতে বাগান কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাগানের ভেতরে থাকা সব কাটা গাছের পরিমাপ করে প্রতিবেদন দিতে বন বিভাগকে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ চা বোর্ড ও বন বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া চা-বাগানের গাছ কাটা বৈধ নয়।
বড়লেখা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা নীলোৎপল সরকার বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বাগান কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই গাছগুলো কেটেছে। এতে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কাও রয়েছে। প্রথম দিন ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০০ ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয়। পরে রোববার বাগানের ভেতরে অভিযান চালিয়ে ১৩০টি গাছের গুঁড়ি এবং আরও দুই শতাধিক ঘনফুট কাটা কাঠ জব্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৭ শতাধিক ঘনফুট কাঠ জব্দ হয়েছে। চূড়ান্ত পরিমাপ শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটা হয়ে থাকে, তাহলে বন বিভাগের নজরে বিষয়টি এত দিন আসেনি কেন। দুই মাস ধরে প্রকাশ্যে গাছ কাটা, পাহাড় থেকে হাতির সাহায্যে কাঠ নামানো এবং ট্রাকে করে বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অজানা থাকার সুযোগ কতটা—তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে সাবাজপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক নাহিদ আহমদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ চা বোর্ডের শর্ত অনুযায়ী প্রতিবছর বাগানের মোট জমির আড়াই শতাংশ নতুন করে চা চাষের আওতায় আনতে হয়। এ শর্ত পূরণের লক্ষ্যে চলতি বছরের এপ্রিলে ১২৫ একর এলাকায় থাকা রোগাক্রান্ত ও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত গাছ অপসারণের অনুমতির জন্য চা বোর্ডে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনটি বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তবে অনুমোদন পাওয়ার আগেই গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।
পরিবেশ ও বনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া চা-বাগানের গাছ কাটা শুধু প্রচলিত আইন ও বিধিমালার লঙ্ঘন নয়, এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং পরিবেশের জন্যও বড় ধরনের হুমকি। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।