হবিগঞ্জ প্রতিনিধি | ১০ জুলাই, ২০২৬
টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে খোয়াই নদে। নদের দুটি প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গবাদিপশু, আসবাব ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছেন তাঁরা।
হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে সদর উপজেলার এক হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এর আগে দুপুরে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদের বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে পানি হাওরে প্রবেশ করে।
কালীগঞ্জ বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, নতুনবাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণুরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর, ধোপাখাল ও বনদক্ষিণ এলাকার একটি অংশসহ অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার অনেক বাড়িঘরে কোমরসমান পানি উঠেছে। পানির স্রোতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি।
পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ স্থানীয় বাসিন্দারা গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, আবার কেউ আশ্রয়কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়েছেন। হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকার কয়েকটি স্থানেও পানি প্রবেশ করেছে।
এদিকে চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজারসংলগ্ন এলাকায় খোয়াই নদের ভাঙন আবারও তীব্র হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ভাঙন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এতে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাসপাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়েছে।
খোয়াই নদের মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত বাঁধ রক্ষায় কাজ করছেন। বাঁশসহ বিভিন্ন উপায়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ্-আবু-জাহের জানান, সদর উপজেলার ৩০টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে এক হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, সদর উপজেলার বাইরে বাহুবলে ১২৫টি এবং বানিয়াচংয়ে ১২০টি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা প্রায় এক হাজার।
তিনি বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাঁচ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও এক হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় এক হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত খোয়াই নদীর বাঁধের দুটি স্থান ভেঙেছে। আরও কয়েকটি স্থানে ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। তবে নতুন করে ভারী বৃষ্টি না হলে নদ-নদীর পানি কমতে পারে।’
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় বস্তায় মাটি ভরে বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে।
এদিকে বন্যার পানি বাড়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে গেছে। এতে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বাড়লে সড়কটিতে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে হবিগঞ্জ সদরের সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে রাত ১১টার দিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বাড়লে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বাঁধ মেরামত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসহায়তা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় এলাকায় উদ্বেগ বিরাজ করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, খোয়াই নদের চুনারুঘাট বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৯২ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে ১১৩ সেন্টিমিটার এবং মাছুলিয়া পয়েন্টে ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও সন্ধ্যার পর কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড।