নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৬ জুলাই, ২০২৬
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল। তিনি প্রায়ই নিজের ফেসবুক একাউন্টে তার বিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া, বাচ্চাদের শরীর চর্চা করানো, শিশুদের নাচ গানের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন চিহ্নসহ পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন পড়া শেখানো, শিক্ষাদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ ও গাছের চারা বিতরণ করার ভিডিও আপ দিতেন। সুন্দর শাড়ি পড়ে পরিপাটি অবস্থায় ভিডিও পোস্ট নিয়ে সমালোচনা ও ট্রল শুরু করে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরের দিকে তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের মেজবার গাওয়া ‘আজ কেন মন, উদাসী হয়ে’ গানের সঙ্গে একটি রিল ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওতে তিনি স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। সুন্দর শাড়ি পড়ে পরিপাটি অবস্থায় ভিডিও পোস্ট নিয়ে সমালোচনা ও ট্রল শুরু করে একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী।
শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের ভিডিওটি নেতিবাচকভাবে ভাইরাল করা হলে তিনি উগ্রবাদী গোষ্ঠির তোপের মুখে পড়েন। ভিডিও করার কারণে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ এই স্কুল শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তুলে। তাই তিনি তার ফেসবুক থেকে ভিডিওটি সরিয়ে নেন। এমন পরিস্থিতিতে বিউটি পালের পাশে দাঁড়িয়েছেন তার সহকর্মী, লেখক, সাংবাদিকসহ নানা পেশার মানুষজন। অভিনব ভাবে বিউটি পালকে নিয়ে সমালোচনা ও ট্রলের প্রতিবাদ জানাচ্ছে সারা দেশের মানুষজন।
বিউটি পালের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অনেক শিক্ষক শিক্ষিকা নিজেদের বিদ্যালয়ের সামনে তার মতো হেঁটে হেঁটে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানের সঙ্গে ফেসবুকে নিজের ভিডিও আপ করছেন। অনেকেই তার ছবি ভিডিও দিয়ে পোস্ট করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তাই বিউটিপাল আপ্লুত হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন কাছে।
বিউটি রাণীর অভিযোগ, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ‘নেতিবাচক ক্যাপশনে’ তার ভিডিও ভাইরাল করেন আসিফ ইকবাল হিরণ নামের এক প্রবাসী তরুণ। ওই তরুণের বিরুদ্ধে তিনি সাইবার বুলিং এবং সামাজিকভাবে হেনস্তারও অভিযোগ তুলেছেন।
বিউটি রাণী পাল বলেন, ‘আমি আসলে রিল (গানসহ ছোট ভিডিও) বানাতে জানি না। আমার এক সহকর্মীকেই বলছিলাম যে কীভাবে রিল বানায়। স্কুল ছুটির পরে স্কুলের আঙিনাতেই আমি হেঁটে গেছি আর উনি ভিডিওটা করেছেন।’
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ আয়োজনে সিলেট জেলায় শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা নির্বাচিত হন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী।
যারা সমালোচনা করছেন, তাদের নিয়ে বিউটি রাণী বলেন, ‘আমরা মুখে দিয়ে বলব কারিকুলাম উন্নত, আর আমাদের মন মানসিকতা থাকবে সংকীর্ণ, তাহলে আমরা কীভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিব? আমাদের মনমানসিকতা যদি এখন ডিজিটালাইজড না করি, স্মার্ট না হই, উন্নত না করি, তাহলে আমরা উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। আমাদের সব দিক দিয়ে সমানতালে চলতে হবে।’
যেভাবে ভিডিওটি ভাইরাল হয়: শিক্ষিকার অভিযোগ অনুযায়ী, ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন নামের একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক (মূলত ব্যক্তিগত পেজ) আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ অনুমতি ছাড়াই তার ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে ভাইরাল করেন। শিক্ষিকা বলেন, ‘উনি আমার ভিডিওটা ডাউনলোড করে নিয়ে উনার পত্রিকায় নিউজ করেছেন এবং উনার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজেও আমার সম্পর্কে আজেবাজে লিখেছেন।’
শিক্ষিকার দাবি, আসিফ ইকবাল হিরণের পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করার কারণে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এই কাজ করেছেন। হিরণ তাকে ফোন করে ব্যক্তিগত প্রশ্ন (বাড়ি কোথায়, তিনি স্থানীয় কি না) করে হেনস্তা করার চেষ্টা করেন। শিক্ষিকা তাকে পোস্টটি ডিলিট করার অনুরোধ জানালেও তিনি তা করতে অস্বীকার করেন।
শিক্ষিকা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত, এভাবে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা কাম্য নয়।’
তিনি শিক্ষক সুরক্ষা আইনের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিলে সমাজ সবচেয়ে বেশি নৈতিক হবে।’
অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি আইনি জটিলতায় না গিয়ে সারা দেশের মানুষের দেওয়া নৈতিক সমর্থনকেই তার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে মনে করছেন।
ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন পেজ ঘেঁটে দেখা যায়, দুদিন আগে বিউটি রাণীর আইডি থেকে ডাউনলোড করে এআই ভয়েসওভারে ভিডিওটি নিউজের মতো পোস্ট করা হয়। ভিডিওর শেষ দিকে বলা হচ্ছে, ফেঞ্চুগঞ্জের সচেতন মহল এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলতে ঠিক কারা বা তাদের কোনো বক্তব্য ভিডিওতে নেই। এমনকি অভিভাবকদের ‘তীব্র প্রতিক্রিয়ারও’ কোনো বক্তব্য নেই।
আরেকটি টেক্সট নিউজে সাধারণ হেঁটে আসার দৃশ্যকে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
শিক্ষিকার অভিযোগের বিষয়ে আসিফ ইকবাল বলেন, ‘আমি ম্যাডামকে আদাব দিয়ে ভিডিওর বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়েছি। আর কিছু বলিনি।’
সাধারণ একটা হেঁটে আসার দৃশ্যকে ‘অশ্লীল’ হিসেবে বর্ণনার কারণ জানত চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো বলিনি। মানুষ বলেছে।’
এ ব্যাপারে রোববার সিলেট সফরে এসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, আমি ভিডিওটি দেখিনি। আমার সেশ্যাল মিডিয়াও নেই। তবে কয়েকজন আমাকে বলেছেন, ‘একজন শিক্ষিকা গান গেয়ে একটি ভিডিও আপলোড করেছেন। এটিতে কোন অশ্লীলতা নেই।’ গান গাওয়াকে আমি অন্যায় মনে করি না। এটি কেউ মানুক বা না মানুক, আমি অন্তত তা মনে করি না।
সূত্র: কালবেলা ও খবরের কাগজ