শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি | ০১ আগস্ট, ২০২৬
দেশের চায়ের রাজধানী খ্যাত ও অন্যতম পর্যটননগরী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। বছরে লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে পৌর শহরটি। গড়ে উঠেছে নতুন নতুন আবাসিক এলাকা, হোটেল-রিসোর্ট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। অথচ এই শহরের প্রশাসনিক সীমানা প্রায় ৯০ বছর ধরে অপরিবর্তিত।
১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীমঙ্গল পৌরসভার আয়তন এখনও মাত্র ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার। ফলে শহরের অংশ হয়ে ওঠা আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ইউনিয়নের অধীনেই থেকে গেছে। এতে নাগরিক সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত নগরায়ণে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় শ্রীমঙ্গল পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজারে পৌঁছেছে। ২০০২ সালে পৌরসভাটি 'ক' শ্রেণিতে উন্নীত হলেও এর আয়তন আর বাড়েনি। বর্তমানে ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি ঘরবাড়ি (হোল্ডিং) রয়েছে। প্রতিবছর পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব আয় প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। পৌর এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়ক, ৩৫ কিলোমিটার ড্রেন, ৬৭৫টি স্ট্রিট লাইট এবং ২ হাজার ৩০০টি পানির লাইন রয়েছে।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, একই আয়তনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগরায়ণের চাপ সামলাতে হচ্ছে। সম্প্রসারণের প্রস্তাবে শ্রীমঙ্গল সদর, কালিঘাট ও আশিদ্রোন ইউনিয়নের রূপসপুর, ভাড়াউড়া, সুইনগর, ফুলছড়া, ভুরভুরিয়া, রামনগর, উত্তরসুরসহ কয়েকটি মৌজা ও গ্রাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৮১ সালে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ হয়েছিল। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সীমানা আর বাড়ে নি। সর্বশেষ গত ১৯ জুলাই নতুন করে সম্প্রসারণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে এটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রস্তাব অনুমোদন হলে পৌরসভার আয়তন ২ দশমিক ৫৮ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার হবে। জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখে উন্নীত হবে এবং ওয়ার্ডের সংখ্যা ৯ থেকে বেড়ে ১২ থেকে ১৪টি হতে পারে। এতে কর আদায়ের পরিধি বাড়বে, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সহজ হবে এবং নতুন এলাকাগুলোতে সড়ক, ড্রেন, স্ট্রিট লাইট ও পানি সরবরাহসহ নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা সুমন দাশ বলেন, আমরা শহরের সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করলেও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে এখনও ইউনিয়নের বাসিন্দা। রাস্তা, ড্রেনেজ, স্ট্রিট লাইট ও বর্জ্য অপসারণের সমস্যায় বছরের পর বছর ভুগছি। পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হলে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশা করছি।
রূপসপুর এলাকার বাসিন্দা রহিম মিয়া বলেন, বাস্তবে আমাদের জীবনযাত্রা পুরোপুরি শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে ইউনিয়নের অধীনে থাকায় অনেক উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। দ্রুত পৌরসভা সম্প্রসারণ বাস্তবায়ন হলে এলাকার মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে।
শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পিয়াশ দাশ বলেন, আমার এলাকার সবুজবাগ এখন কার্যত শহরেরই অংশ। কিন্তু ইউনিয়নের আওতায় থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত বরাদ্দ পাওয়া যায়। ফলে রাস্তা, ড্রেন, স্ট্রিট লাইট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ মৌলিক নাগরিক সেবায় পিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। এলাকাটি পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হলে পরিকল্পিত উন্নয়ন হবে, বরাদ্দ বাড়বে এবং মানুষ প্রত্যাশিত নাগরিক সুবিধা পাবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, পর্যটন নগরী খ্যাত শ্রীমঙ্গল পৌরসভা ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিগত ৯০ বছরে এর যে মূল আয়তন, সেটি ২.৫৮ বর্গকিলোমিটারই রয়ে গেছে। কিন্তু মানুষের চলাচল, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সংখ্যা এবং নাগরিক সংখ্যা সবকিছুই বৃদ্ধি পেয়েছে।
সার্বিক বিবেচনায় জনসেবা নিশ্চিত করার জন্য এবং নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির জন্য এখানে দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভা এলাকা সম্প্রসারণের জন্য একটি চাহিদা রয়েছে। ইতিপূর্বেও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পৌরসভার পক্ষ থেকে নতুন করে উদ্যোগ স্থাপন করা হয়েছে এবং আমরা ইতিমধ্যেই শ্রীমঙ্গল পৌরসভা থেকে স্থানীয় সকলের মতামত সংগ্রহ করে এবং সকল কাগজপত্র সংগ্রহ করে আমরা সরকার বরাবর সেটি প্রেরণ করেছি।
আমরা আশা করছি, সরকারের প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে এখানকার জনগণের কথা এবং নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে দ্রুততম সময়ে সেটি অনুমোদন হবে। আমরা আশা করছি, এখানকার জনগণকে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।