Sylhet Today 24 PRINT

একে তো লোডশেডিং, তার উপর ভুতুড়ে বিল— দুর্ভোগে গ্রাহক

শংকর শীল ও ইয়াকুব শাহরিয়ার |  ০৩ আগস্ট, ২০২৬

ছবি: ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ

দিনে বিদ্যুৎ থাকে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অথচ বিল আসে আগের তুলনায় দিগুণ তিনগুণ- সিলেট বিভাগের অনেক এলাকার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের এখন এই দুই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে।

তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং আর বাড়তি বিলের কারণে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের অবস্থা নাজুক।

চুনারুঘাট: হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় লোডশেডিং ও অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে-রাতে মিলিয়ে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এর মধ্যে অনেক গ্রাহকের বিল আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ আসায় জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, মাগরিবের নামাজের পর লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে থাকে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে চুরি-ছিনতাইয়ের আশঙ্কা। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা - যাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে টেলিভিশন, ফ্রিজসহ দামি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।
ভুক্তভোগী আসমা বেগম বলেন, আমার স্বামী বিদেশে থাকেন। ব্যাংকে বিল দিতে গিয়ে দেখি সার্ভারে কাগজের চেয়ে বেশি বিল দেখাচ্ছে। পরে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সেটি ঠিক করে বিল দিতে হয়েছে। ছোট বাচ্চা নিয়ে এই গরমে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

ফরিদ মিয়া নামের আরেক গ্রাহক জানান, গত তিন মাস ধরে তার বাড়িতে কোনো বিলের কাগজ আসেনি। অথচ হঠাৎ লাইনম্যান এসে তার বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। দিদার মিয়া নামের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, দেড় ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ যায়, আর আসে মাত্র ১০-১৫ মিনিটের জন্য। এতে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

বিকাশ ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চুনারুঘাটে এখন বিদ্যুৎ যায় না, বরং মাঝে মাঝে আসে। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকলেও বিল আসে কয়েক গুণ বেশি।

এ বিষয়ে চুনারুঘাট পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল অফিসের (ডিজিএম) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ৩৩ কেভি গ্রিড লাইনে ত্রুটি ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে।

শান্তিগঞ্জ: শান্তিগঞ্জে বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উপজেলার আট ইউনিয়নের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিদ্যুতের ঘন ঘন যাওয়া-আসায় জনজীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। সুস্থ মানুষের হাঁসফাঁস সহ্য করা গেলেও রোগীদের আর্তনাদ ও প্রবীণদের হাহাকারে পরিস্থিতি আরও পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনের এমন লোডশেডিংয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে দ্রুত মুক্তির কোনো উপায়ও খুঁজে পাচ্ছেন না পল্লী বিদ্যুতের ওপর ‘জিম্মি’ হয়ে পড়া গ্রাহকরা। ফলে উপজেলার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় এ ক্ষোভ রাজপথে আন্দোলনের রূপ নিতে পারে। তাই বিদ্যুতের এ ভোগান্তির স্থায়ী সমাধান চান তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বণ্টনের সুবিধার্থে উপজেলার আটটি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রামকে ছয়টি ফিডারে ভাগ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ। এসব ফিডারে প্রায় ৩৬ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। কিন্তু দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না তারা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। উপজেলা সদর এলাকা এক নম্বর ফিডারের আওতায় থাকায় শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিষদ, শান্তিগঞ্জ থানা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কারণে এ এলাকায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে বাকি ফিডারের গ্রাহকদের নিয়মিত লোডশেডিংয়ের মধ্যেই দিন কাটাতে হচ্ছে।

এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা। তাদের ভাষ্য, বর্তমানে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলছে। এইচএসসি পরীক্ষা প্রায় শেষ পর্যায়ে, ডিগ্রি পরীক্ষা চলমান এবং সামনে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষাও শুরু হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছেন না। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন, আর রোগীদের দুর্ভোগও বেড়েছে কয়েক গুণ। বিশেষ করে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবসায়ী সজীব আচার্য, সজিব আহমদ ও সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের ব্যবসা শতভাগ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। আইপিএস ব্যবহার করেও কাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, কারণ কিছুক্ষণ পরই চার্জ শেষ হয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না, ফটোকপি মেশিন চালানো যাচ্ছে না। অনেকের দৈনিক ও মাসিক কিস্তি রয়েছে। আয় না থাকায় কিস্তি পরিশোধ ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা, নাছুহা কবির ও জাকারিয়া ইসলাম রাতুল বলেন, গত বৃহস্পতিবার তাদের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পুরো পরীক্ষাকালেই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ঠিকমতো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার ওপর প্রচণ্ড গরম পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে। তারা বলেন, যেহেতু লোডশেডিং সারা দেশের সমস্যা, তাই সরকারকে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

তাহিরুন নেছা নামে এক নারী জানান, তিনি তাঁর অসুস্থ বোনকে নিয়ে চার দিন শান্তিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন। প্রচণ্ড গরম ও অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালে থাকাও তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছিল।

উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের এইচ এম নাছির, সাব্বির আহমদ, নোয়াখালী এলাকার আলী আহমদ দুলাল এবং পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের কামাল হোসেন ও নাঈম আহমদ বলেন, আমরা অতিষ্ঠ, খুবই অতিষ্ঠ। এভাবে আর চলতে পারে না। দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে লোকসান হচ্ছে, রোগীরা কষ্ট পাচ্ছেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারছে না, রাতে ঘুমানো যায় না। প্রয়োজন হলে বিদ্যুতের দাবিতে আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।

শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলায় গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। প্রতিদিন ঘণ্টায় ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, কখনো কখনো এর চেয়েও বেশি। বর্তমানে উপজেলায় সাড়ে ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র আড়াই থেকে ৩ মেগাওয়াট। ফলে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পরবর্তী এক ঘণ্টা লাইন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। একইভাবে সারা জেলায় প্রায় ৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পল্লী বিদ্যুৎ পাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৪ মেগাওয়াট। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়লে দ্রুত এ সংকট কাটার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শান্তিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের এজিএম রাসেল আহমদ বলেন, লোডশেডিং এখন জাতীয় সমস্যা। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় আমরা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছি না। ফলে দিন-রাতের প্রায় অর্ধেক সময় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। উপজেলা সদরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা ও অন্যান্য জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান থাকায় সেগুলোকেও অগ্রাধিকার দিতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশের নিজস্ব জেনারেটরও নেই। মূল সমস্যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি। তবে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করছি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.