শাকিলা ববি | ১০ আগস্ট, ২০২৬
রোববার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের মাধবপুরে তেলবাহী লরি, বালুবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। এরআগে গত শুক্রবার এই মহাসড়কের সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন।
কেবল এ দুটি নয়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এখন দুর্ঘটনা ঘটছে নিয়মিতই। বাড়ছে মৃত্যর মিছিল। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার কাজ চলা এই মহাসড়কের অবস্থা এখন একেবারেই নাজুক। পুরো সড়কই ভাঙচোরা। স্থানে স্থানে বড় বড় গর্ত। বর্ষায় টানা বৃষ্টিতে এই সড়কটি এখন চালাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে এই সড়কের যান চালকের অনিয়ন্ত্রিত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং আর সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা বাজার- এই সব মিলিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ঝুঁকি আরও বাড়িয় তুলেছে।
প্রায় প্রতি মাসেই এখানে কোনো না কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। চালকদের বেপরোয়া গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিং, এই সড়কের ভৌগোলিক ও কাঠামোগত ত্রুটি, বিপজ্জনক মোড়, মহাসড়কে মিশ্র ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলের কারণে সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক রীতিমতো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
গত সাত মাসে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে ২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
গত শুক্রবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ৭ জন। এর আগে গত ৩ মে এই মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমা তেলিবাজার এলাকায় কাঁঠালবোঝাই ট্রাক ও শ্রমিক বহনকারী ডিআই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৮ জন নিহত হন। এতে ৪ জন ঘটনা স্থলে ও ৪ জন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। এই দুটি দুর্ঘটনা বড় এবং প্রাণহানি বেশি হওয়াতে সবার নজরে আসে। কিন্তু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা হয়। এসব দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলচালক, আরোহী, সিএনজি ও লেগুনাচালক, আরোহী আহত বা নিহত হন।
শেরপুর হাইওয়ে থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই–এই ছয় মাসে সিলেটের মহাসড়কগুলোতে ১৮৫ দুর্ঘটনায় ১১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, গুরুতর আহত হয়েছেন ১০৯ জন।
এ ব্যাপারে শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, মূলত চালকদের বেপরোয়া গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিংয়ের কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ যাত্রার কারণে এই অঞ্চলে এসে চালকদের মধ্যে একদিকে যেমন ক্লান্তি চলে আসে অন্যদিকে দ্রুত গন্তব্যে যাওয়ার তাড়া থাকে। তাই ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুর থেকে সিলেট অংশ পর্যন্ত কয়েকটি এলাকা দুর্ঘটনাপ্রবণ হয়ে উঠেছে। আশা করছি, এই মহাসড়কের ৬ লেনের কাজ সম্পন্ন হলে দুর্ঘটনা অনেকটাই হ্রাস পাবে।
এদিকে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট বিভাগীয় কমিটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সাত মাসে সিলেট বিভাগে ১৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৯ জন নিহত ও ৩৬১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে ২৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২ জন প্রাণ হারান।
এ ব্যাপারে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা শাখা আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম মিশু বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সিলেট অংশে সড়ক ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। এখানে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং ও সড়কের নির্মাণের ত্রুটি।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণের ওপর আরও জোর দিতে হবে এবং মহাসড়কে পরিবহনের চালকরা যেন ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালান তা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে চালক ও শ্রমিকনেতারা বলছেন হাইওয়েতে গাড়িচালকদের জন্য সচেতনতামূলক ট্রেনিং, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কে লেগুনা, সিএনজিসহ অবৈধ যানবাহন চলাচলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন বলেন, আন্তজেলা রোডে এক হাজার চালক, হেল্পার, সুপারপভাইজার আছেন। তাদের সবার মনমানিসকতা এক না। কেউ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান আবার কেউ নিয়ম মেনেই গাড়ি চালান। কিন্তু মহাসড়কে গাড়িচালক হেল্পার, সুপারপভাইজারদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক সেমিনার বা ট্রেনিং করানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সব জায়গায় দুর্ঘটনা হচ্ছে না। তেলিবাজার, রশিদপুর, দয়ামির, কাশিকাপন, এলাকায় বেশি দুর্ঘটনা হচ্ছে। কেন এই এলাগুলোতেই হচ্ছে? এটি নিয়ে সবার ভাবা উচিত। আমরা যদি লক্ষ করি, এই এলাকাগুলোতে নিয়মিত মহাসড়কে সিএনজি, লেগুনা, পিকআপ চলাচল করে। কিন্তু মহসড়কে এসব যানবাহন চলাচলের কথা নয়। সড়কে চলাচলের সময় আইন মানতে বাধ্য করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। এ ছাড়া এই সড়কের ভৌগোলিক ও কাঠামোগত কিছু ত্রুটি রয়েছে। এই এলাগুলোতে বিপজ্জনক কিছু মোড় রয়েছে। সেগুলো সম্পর্কেও চালকদের সচেতন করা দরকার। তাই আমি চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সেমিনার, ট্রেনিং করানোর দাবি জানাই।’