সিলেটটুডে ডেস্ক | ১৩ আগস্ট, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার নিজ বাসায় প্রবীণ ব্যবসায়ী, তার স্ত্রী ও গৃহকর্মীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার ৬ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ।
বুধবার সকালে এ হত্যাকাণ্ডের পর বিকেলে বাবুল মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, ওই বাসার খুন হওয়া গৃহকর্মীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে ব্যর্থ হয়েই বাবুল মিয়া একাই তিনজনকে খুন করেন। জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে পুলিশ এমনটি দাবি করলেও এ ঘটনা নিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যার উত্তর মিলছে না। ফলে পুলিশের 'রহস্য উদঘাটনের' দাবি নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে।
বুধবার সকালে নিজ বাসায় খুন হন সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক, ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০) তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৫) ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)। সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির চার সন্তানই ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় থাকেন।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুলিশ জানায়, নিহত দম্পতির বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রব খোলা রয়েছে। স্বর্ণালংকারসহ জিনিসপত্র খোয়া যায়। এছাড়া বাসার মেঝেতে জমির একটি দলিল পড়ে থাকার কথা জানা যায়।
প্রশ্ন ওঠেছে, কেবল শারীরিক সম্পর্কে বাধার কারণে তিনজনকে খুন করা হলে বাসার জিনিসপত্র লুট করল কে? জমির দলিলই বা মেঝেতে কেন? একজন অপেশাদার 'খুনির' দ্বারা কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই সকালে একা তিন জনকে খুন করা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। খুন হওয়া গৃহকর্মী আর আটক বাবুল মিয়ার বয়সের পার্থক্যের কারণেও তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক হওয়া কতটুকু বাস্তবসম্মত এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
এছাড়া আব্দুস সাত্তারের জমিসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টিও আলোচিত হচ্ছে। বিশেষত আব্দুস সাত্তারের জমিসংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি ছিল ১৯ আগস্ট। এই রায়ের এক সপ্তাহ আগে এমন হত্যাকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে।
এই জমিসংক্রান্ত বিরোধের দিকে ইঙ্গিত করে বুধবারই আব্দুস সাত্তারের এক আত্মীয় বলেন, আমরা আগেই ধারণা করেছিলাম, এরকম কিছু (হত্যাকাণ্ড) হতে পারে। এর আগেও আব্দুস সাত্তারকে বাসায় এসে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হুমকি পেয়ে আব্দুস সাত্তারের মেয়ে থানায় জিডিও করেছিলেন।
হত্যার খবরে পেয়ে বুধবার ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার (এসএমপি) কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, বাসার ওয়ারড্রব ও আলমারি খোলা আছে। স্বর্ণসহ দামি জিনিস খোয়া গেছে বলে জেনেছি। চুরি ডাকাতির ঘটনা কী না তা তদন্ত করা হচ্ছে। এখানে একটি দলিলও পাওয়া গেছে। সেটিও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এছাড়া অন্য কোন কারণে হত্যা করা হয়েছে কী না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া পারিবারিক বিরোধ আছে কী না তাও খতিয়ে দেখছি। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এই তিন বিষয় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এমন বহুমুখী সন্দেহ ও আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছিল দিনভর। তবে ঘটনার মোড় ঘুরে যায় বিকেলে ওই এলাকারই একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়া নামে একজনকে আটকের পর।
বাবুল মিয়াকে আটকের পর সন্ধ্যায় পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, বাবুল মিয়া ওই বাসার রংমিস্ত্রির কাজ করত, মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত। ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় গিয়ে গৃহকর্মীকে নিয়ে একটি কক্ষে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে মেয়েটিকে আঘাত করে।
তিনি বলেন, শব্দ পেয়ে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে আসেন। তখন তাকেও ছুরি মেরে হত্যা করে বাবুল। পরে সে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশের এমন দাবি নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে আইনজীবী ও সাংবাদিক মইনুল হক বুলবুল ফেসবুকে লিখেন- শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য প্রেমিকার কাছে আসলে, সে সময়টা সকাল সাড়ে ৯টা উপযুক্ত কি? যদি শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য আসে, তবে সঙ্গে খুন করার উপযোগী ছুরি রাখার দরকার কী? খুন করার পর বাসার পাশের খালি জায়গায় ছুরি ফেলে যাওয়ার দরকার কী? তিনটি খুন করার পুরও খুনি আটক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত একই পাড়ায় কেন অবস্থান করছিল?
পুলিশ বলছে, ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসার সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। এ সুযোগেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের আগ মুহূর্তের ফুটেজ দেখে বাবুল মিয়াকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
এসব ব্যাপারে বৃহস্পতিবার সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মো. মঈনুল জাকির বলেন, বাবুল মিয়া নিজেই হত্যাকাণ্ডের কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে।
বাসা থেকে মালামাল খোয়া যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাসায় কী কী জিনিস ছিল বা কী কী খোয়া গেছে এরকম কোন তথ্য বা অভিযোগ আমরা পাইনি। আটক বাবুল মিয়াও জানিয়েছেন, তিনি কোন মালামাল নেননি।
আগের দিনের পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রব খোলা ছিল। তাই কোন মালামাল খোয়া গেছে কী না তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছিলেন কমিশনার মহোদয়।
ওসি বলেন, এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে আজ মামলা দায়ের করা হবে। এরপর আসামিকে কোর্টে হাজির করা হবে।
জানা যায়, নগরীর রিকাবীবাজারে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণ নিয়ে একটি প্রভাবশালী পক্ষের সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের কোটি টাকার জমি নিয়ে স্বত্ব মামলা চলছে।
নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, রিকাবীবাজারের জায়গা নিয়ে সাত্তার ২০২৩ সালে স্বত্ব মামলা (নম্বর ২১১/২৩) করেন। আদালতের আদেশের পর ওই মামলার বিবাদী সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সাত্তারকে বিবাদী করে সিভিল রিভিশন মামলা (নম্বর ৭০/২৩) দায়ের করেন। আগামী ১৯ আগস্ট ওই মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল।
আইনজীবী বলেন, প্রতিটি শুনানিতে আব্দুস সাত্তার আদালতে হাজিরা দিতেন। দুই সপ্তাহ আগেও শুনানির দিনে আসেন। ওই দিন বিবাদী সিরাজুল ইসলাম তাকে হুমকিও দেন এবং খারাপ ব্যবহার করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর সাত্তারের ঘরের তিনটি ওয়ারড্রব ও আলমারি তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখান থেকে মামলার নথিপত্র ও মূল দলিল খোয়া গেছে। ঘরের মেঝেতে কেবল একটি দলিলের অনুলিপি পড়ে থাকতে দেখা যায়। শুনানির মাত্র ছয় দিন আগে এই হত্যাকাণ্ড এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব হওয়া কেবলই কাকতালীয় কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের কারণেই পরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। রিকাবীবাজারের জায়গার বিরোধকে এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান সূত্র হিসেবে ধরে তদন্ত করার দাবি জানান তিনি।