নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ আগস্ট, ২০২৬
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকার মিতালী সমাজকল্যান সমিতির সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম। এই এলাকারই মুরব্বী আব্দুস সাত্তার। যিনি নিজ বাসায় স্ত্রী ও গৃহকর্মীসহ খুন হয়েছেন। পুলিশ বলছে, গৃহকর্মীর সম্পর্কের বল হয়েছেন এই তিনজন।
তবে পুলিশের এমন ভাষ্য মানতে নারাজ নুরুল ইসলাম। খুন হওয়া আব্দুস সাত্তারের সাথে তার ছিলো ঘনিষ্ট সম্পর্ক। নুরুল ইসলাম বলেন, এই মার্ডার কোন প্রেমকাহিনী বা অনৈতিক সম্পর্কের কারণে হয়েছে বলে আমার মনে হয় ন। ওই মেয়েটা (গৃহকমী তাহমিনা) এই বাসায় আসছে ২২ দিন আগে। বাচ্চা একটা মেয়ে। ২২ দিনের ভিতরে গ্রাম থেকে এসে ৪০ বছরের লোকের সাথে এতোকিছু করে ফেলবে বলে বিশ্বাস হয় না। এর পছেনে অন্য কোন রহস্য আছে। পুলিশকে তা খুঁজে বের করতে হবে।
গত বুধবার নগরীর রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার নিজ বাসা ‘মিতালী ১১১ নিকুঞ্জ ভিলা’য় খুন হন প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার. তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও তাদের কাজের মেয়ে তাহমিনার (১৮)।
হত্যাকান্ডের পর ওইদিনই পুলিশ বাবুল মিয়া নামে এক ব্যক্তেকে আটক করে। পুলিশর দাবি, পেশায় রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়ার সাথে গৃহকর্মী তাহমিনার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকালে শারিরীক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে বাবুল মিয়া একে একে তিনজনকে খুন করে। বাবুল মিয়া হত্যার কথা স্বীকা করেছে বলেও দাবি পুলিশের।
তবে পুলিশের এমন বক্তব্য মানছেন না স্থানীয় বাসিন্দারে কেউই। সিলেটজুড়েই পুলিশে দাবি নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। আব্দুল সাত্তারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিয়িটিও আলোচিত হচ্ছে। নুরুল ইসলামের মতো অনেকেই এ ঘটনার অন্য রহস্য খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন।
এদিকে, আটক বাবুল মিয়া রংমিস্ত্রির পাশাপাশি কসাইয়ের কাজ করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে বাবুল রায়নগর এলাকার যে কলোনীতে ভাড়া থাকতেন সেখানকার মালিকপক্ষ জানিয়েছে, বাবুল কখনো কসাইয়ের কাজ করতেন না।
এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করেছে মিতালী আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতি ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডবাসী। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক ব্যক্তির পক্ষে এত কম সময়ে তিনজনকে হত্যা করা রহস্যজনক।
মিতালী আবাসিক এলাকা সমাজকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক নাজু বলেন, এত কম সময়ে তিনজন মানুষকে হত্যা করা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি পেশাদার খুনিদের কাজ। প্রেমঘটিত ঝগড়া হলে ঘরের দলিলপত্র ও মূল্যবান জিনিসপত্র উধাও হবে কেন?
সমিতির কোষাধ্যক্ষ হুমায়ুন কবির শামীম এবং স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রউফ তাফাদার বলেন, পুলিশ বুধবার রাতে যে খালি প্লটে তল্লাশি চালিয়ে কিছুই পায়নি, পরদিন সকালে সেখান থেকেই উদ্ধার হওয়া ছোরায় কেন রক্তের কোনো দাগ পাওয়া গেল না–তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়েছে।
পুলিশের দাবি, বাসার গৃহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও গালিগালাজ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাক্তন কসাই ও বর্তমানে রংমিস্ত্রি বাবুল ঘরে ঢুকে তিনজনকে হত্যা করেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজ এ দাবির বিপরীত চিত্র প্রকাশ করছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকাল ৯টা ২২ মিনিটে বাবুল রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। অথচ ঘরের ভেতরের চিৎকার ও আর্তনাদ শোনা গেছে সকাল ৯টা ২৫ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে। বাবুল বেরিয়ে যাওয়ার পর কীভাবে ঘরে চিৎকার হলো–এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
হত্যাকান্ডের দিনই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের কারণেই পরিকল্পিতভাবে আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। রিকাবীবাজারের জায়গার বিরোধকে এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান সূত্র হিসেবে ধরে তদন্ত করার দাবি জানান তিনি।
এসব ব্যাপারে বৃহস্পতিবার সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মো. মঈনুল জাকির বলেন, বাবুল মিয়া নিজেই হত্যাকাণ্ডের কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে।
বাসা থেকে মালামাল খোয়া যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাসায় কী কী জিনিস ছিল বা কী কী খোয়া গেছে এরকম কোন তথ্য বা অভিযোগ আমরা পাইনি। আটক বাবুল মিয়াও জানিয়েছেন, তিনি কোন মালামাল নেননি।
আগের দিনের পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাসার আলমারি ও ওয়ারড্রব খোলা ছিল। তাই কোন মালামাল খোয়া গেছে কী না তা খতিয়ে দেখার কথা বলেছিলেন কমিশনার মহোদয়।
এ বিষয়ে এসএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) মনজুরুল আলম বলেন, প্রাথমিকভাবে বাবুলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কিনা, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার বাবুল মিয়াকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আর আজকে দাফন শেষে আব্দুস সাত্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হবে বলে জানা গেছে।
পুলিশ যা বলছে
বৃহস্পতিবার হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, গালি দেওয়ায় তাহমিনার উপর ক্ষুব্দ ছিলেন বাবুল।
তিনি বলেন, সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির গৃহকর্মী তাহমিনা রংমিস্ত্রি বাবুলকে গালি দিয়েছিলেন। এই গালিতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবুল প্রথমে তাহমিনাকে ছোরা দিয়ে বুকে আঘাত করেন। পরে সাত্তারের স্ত্রী ও সাত্তারকে ছোরা দিয়ে আঘাত করে পরে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তিনি জানান, বাবুলের তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে রায়নগরের একটি খালি প্লটে পুনরায় তল্লাশি চালিয়ে রক্তমাখা ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
যদিও এরআগে বুধবার সন্ধ্যায় বাবুল মিয়াকে আটকের পর সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেছিলেন, বাবুল মিয়া ওই বাসার রংমিস্ত্রির কাজ করত, মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত। ওই বাসার গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় গিয়ে গৃহকর্মীকে নিয়ে একটি কক্ষে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে মেয়েটিকে আঘাত করে।
তিনি বলেন, শব্দ পেয়ে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে আসেন। তখন তাকেও ছুরি মেরে হত্যা করে বাবুল। পরে সে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।
আলোচনায় জমি নিয়ে বিরোধ
নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট চেম্বার অব কমার্সের প্রাক্তন পরিচালক ও প্রতিষ্ঠিত কয়লা ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি সিলেট স্টেডিয়ামের পাশে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির লিজ নেওয়া জায়গায় বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। ওই জায়গার নির্মাণাধীন ‘ইম্পালস টাওয়ারে’র মালিক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর মামলা চলছিল।
নিহতের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, মামলার কাজে আব্দুস সাত্তার নিয়মিত আদালতে আসতেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও আদালত এলাকায় তাঁকে প্রতিপক্ষ হেনস্থা করেছিল। মামলা-সংশ্লিষ্ট তৌহিদুল ইসলাম জানান, কয়েক মাস আগে বাসায় গিয়েও সাত্তারকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি আপস করেননি।
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে নিহত সাত্তারের চার সন্তানের মধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা দুই মেয়ে বৃহস্পতিবার সিলেটে পৌঁছেছেন। আজ দেশে আসবেন ছেলে ও অন্য মেয়ে।