হবিগঞ্জ প্রতিনিধি | ১৬ আগস্ট, ২০২৬
হবিগঞ্জে শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় ফের কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে শিল্পাঞ্চত্টোনা তিনদিন বন্ধ থাকার পর জেলার ১৭১ কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। কাজে ফিরেছেন শ্রমিকরা।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। শনিবার অনেকে কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়। বকেীগুলো সচল হয় রোববার (১৬ আগন্ট)। তবে এখনো গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে বলে জানিয়েছে জালালাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডডি সিস্টেম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন-দক্ষিণ) প্রকৌশলী মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘হবিগঞ্জ লাইনে এখন গ্যাসের সরবরাহ মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। আশা করি, এলএনজি সরবরাহ ঠিক থাকলে তা অব্যাহত থাকবে।’
জালালাবাদ গ্যাসের শাহজিবাজার ব্যবস্থাপক খালেদ গনি বলেন, ‘শনিবার সকাল থেকেই হবিগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলোর লাইনে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। সরবরাহ অব্যাহত থাকলে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে ফিরতে পারবে।’
এর আগে প্রায় ২০ দিন ধরে হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট চলছিল। শুরুতে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। তবে বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে শিল্পকারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানার প্রায় সবগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে। কোথাও শ্রমিকরা অলস সময় কাটান, আবার কোথাও শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো হয়। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় শ্রমিকদের মধ্যে ছাঁটাই আতঙ্কও দেখা দেয়। গ্যাসের অভাবে শুধু উৎপাদনই বন্ধ হয়নি, অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও সংকট তৈরি হয়।
গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খরচ বহন করতে হচ্ছিল শিল্পমালিকদের। উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রতিদিনই বড় অঙ্কের উৎপাদন ও রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রপ্তানিমুখী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও। পাইওনিয়ার ডেনিম লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাব্বি বলেন, শনিবার সকাল থেকেই তাদের কারখানায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। গ্যাস পাওয়ায় মেশিন চালু করে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়েছে।
সায়হাম স্পিনিং মিলসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা লিয়াকত হোসাইন বলেন, শনিবার সকাল থেকেই তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কয়েক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় ক্ষতি হয়েছে। তবে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে দ্রুত উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
স্কয়ার ডেনিমের লি. এর মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন বলেন, ‘(শুক্রবার) রাত থেকেই গ্যাস সরবরাহ কিছুটা শুরু হয়। কিন্তু আমরা পুরোপুরি পেয়েছি শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায়। ’
তিনি বলেন, ‘গ্যাস চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেশিন চালু করা যায় না। গ্যাস সরবরাহ স্টেবল হওয়ার পর শনিবার সকাল থেকে জেনারেটর চালু করেছি। মিল চালু করেছি। সবাইকে প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে।’
কোম্পানির শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে আমাদের মধ্যে একটা উদ্বেগ ছিল যে, কারখানা যদি বেশিদিন বন্ধ থাকে তাহলে আমাদের চাকরি থাকবে না। আমরা চলবো কী করে। মালিক কতদিন লস করে আমাদের বেতন দিয়ে চালাবেন।’
তিনি বলেন, ‘শনিবার থেকে আমরা কাজে ফিরতে পেরেছি। কারখানা আবার চালু হয়েছে। খুবই আনন্দ লাগছে।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব শিল্পকারখানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেড় লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ফলে গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শিল্প খাতেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও পড়ার আশঙ্কা ছিল।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় আপাতত সেই সংকট কিছুটা কেটেছে। কারখানাগুলোতে উৎপাদন ফের শুরু হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, স্থানীয় বাজার, বাড়িভাড়া, পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যও স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, হবিগঞ্জে গ্যাস উৎপাদন হলেও স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলোকে গ্যাস সংকটে পড়তে হচ্ছে। তাদের দাবি, হবিগঞ্জে উৎপাদিত গ্যাসের একটি অংশ স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা মেটাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের অন্য এলাকার গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাও এমনভাবে সমন্বয় করা দরকার, যাতে স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলো বারবার সংকটে না পড়ে।
উদ্যোক্তাদের মতে, সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করলেই হবে না। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের সংকটে উৎপাদন বন্ধ না হয়, সে জন্য শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে।