ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ | ১৭ আগস্ট, ২০২৬
হৃদয় পালের বয়স ১৭ বছর। চলতি বছর শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে শিক্ষাজীবন থামিয়ে প্রায় আড়াই মাস আগে বাড়ি ছাড়েন তিনি।
এরপর ভারতের নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে পৌঁছান সর্বনাশের দেশ লিবিয়ায়। সেখান থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন হৃদয়। এখন ছেলের ফেরার পথ চেয়ে দিন গুনছেন বাবা-মা।
হৃদয়ের বাবা রন্টু চন্দ্র পাল ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় ১৫ দিন ছেলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাঁর। ফোনে বাবা ছেলেকে বারবার সতর্ক করতেন—যেন কারও সঙ্গে ঝগড়া বা মনোমালিন্যে না জড়ান। কিন্তু গ্রিসে যাওয়ার জন্য কথিত ‘গেম’ হওয়ার কথা ছিল গত ১ আগস্ট। সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল কি না, সেটিও জানেন না পরিবারের সদস্যরা। ওই সময়ের পর থেকেই হৃদয়ের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ তাদের।
হৃদয় শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের পালপাড়ার বাসিন্দা। তাঁর সঙ্গে একই পথে ছিলেন পাথারিয়া ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামের তিনজন, জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রামের একজন এবং পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের একজনসহ মোট ছয়জন। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে অনেকে গ্রিসে পৌঁছেছেন বলে পরিবারগুলো জানতে পেরেছে। কিন্তু হৃদয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি।
শুধু হৃদয় নন, একইভাবে নিখোঁজ রয়েছেন শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের ২৮ বছর বয়সী সোহেল মিয়াও। তিনি ইছন মিয়ার ছেলে। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় সোহেল। হতদরিদ্র পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে ভাগ্য বদলের আশায় কথিত ‘বাইরোডে’ পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথেই তাঁরও কোনো খোঁজ নেই।
নিখোঁজদের তালিকায় আরও রয়েছেন পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের মো. তালহা এবং চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খান, রিপন মিয়া ও মামুন খাঁন। বিভিন্ন সূত্র ও পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত শান্তিগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের অন্তত ছয়জন তরুণের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারেরগুলোর সাথে কথা বলে জানা গেছে, নিখোঁজ সন্তানদের প্রত্যেকেই ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে তাঁদের সন্তানরা বিদেশে পাড়ি জমান। তবে ঠিক কার মাধ্যমে কে লিবিয়ায় গেছেন, সে বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এখনো বিস্তারিত বলতে রাজি নন। তাঁদের ভাষ্য, আগে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে ও নিশ্চিত হয়ে পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডুংরিয়া গ্রামের সোহেল মিয়া ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের হৃদয় পালকে লিবিয়ায় পাঠানোর সঙ্গে ডুংরিয়া গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কুদ্দুস মিয়া তাঁদের লিবিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। তবে তিনি ক্যামেরার সামনে কিংবা রেকর্ডে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের একটি গোপন ভিডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
নিখোঁজ এনামুল খানের বাবা ইসলাম উদ্দিন বলেন, আসার ছেলে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার কথা ছিলো। এখন তার কোনো খোঁজ আমরা পাচ্ছি না। এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চাইছি না। অপেক্ষা করছি, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি। মাধ্যমগুলোও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদি আমার ছেলের কোনো ক্ষতি হয়, আমরাই আপনাদের ডেকে সবকিছু বলবো। আমাদের একটু সময় দিন।
হৃদয় পালের বাবা রন্টু চন্দ্র পাল বলেন, অনেক অনেক কিছু বলছে। কেউ বলছে মিশরের হাসপাতালে। কেউ বলছে আমার ছেলে আর নেই (কান্নায় ভেঙে পড়েন)। অনুরোধ করে তিনি বলেন, দয়া করে আমার ছেলেকে নিয়ে কেউ বিভ্রান্তিকর কোনো তথ্য দিবেন না। যারা নিয়েছে, তারা চেষ্টা করছে। আমরাও আশাবাদী। নিশ্চয়ই ভগবান আমাদের উপর রুষ্ট হবেন না।
ক্যামেরার সামনে কথা বলেননি হৃদয় ও সোহেলকে লিবিয়া পাঠানো কুদ্দুস মিয়া। তিনি বলেন, এরা নিখোঁজ হয়নি। আমরা তাদেরকে খোঁজে পেতে কাজ করছি। এই বক্তব্যের একটি গোপন ভিডিও এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অলী উল্লাহ বলেন, আমরা তাদের আত্মীয় স্বজনের সাথে কথা বলেছি। একজন ছাড়া বাকীদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আত্মীয়রা।
প্রসঙ্গত, সোমবার (৩ আগস্ট) রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।
যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই নৌকাটি নিয়ে বিপজ্জনক যাত্রা অব্যাহত রাখেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে নৌকাটি সাগরে ভাসতে থাকে। এতে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। আর নিঁখোজ রয়েনে কয়েকজন।