Sylhet Today 24 PRINT

রেমা-কালেঙ্গার গহিন বনে বিশালাকৃতির কাঠবিড়ালি

চুনারুঘাট প্রতিনিধি  |  ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গহিন অরণ্যে দেখা মিলেছে বিরল ও বিশালাকৃতির এক কাঠবিড়ালির। প্রাণিবিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম ‘মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল’। স্থানীয়ভাবে এটি ‘কালো কাঠবিড়ালি’ বা ‘রাতুফা বাইকালার’ নামে পরিচিত।

সম্প্রতি বনের গভীরে বিরল এই প্রাণীটির কয়েকটি ছবি তুলেছেন শৌখিন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী শাহেদ আহমেদ। এরপর থেকেই বন্যপ্রাণীপ্রেমী ও গবেষকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে সাধারণত যেসব কাঠবিড়ালি দেখা যায়, সেগুলোর তুলনায় এটি আকারে অনেক বড়। এটি মূলত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কাঠবিড়ালি প্রজাতি। আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়া প্রাণীটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বন কর্মকর্তারা জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের মাথা থেকে শরীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর ঝোপালো লেজটি শরীরের সমান লম্বা হয়, অর্থাৎ পুরো দৈর্ঘ্য এক মিটারেরও বেশি হতে পারে। এর ওজনও হয় নজরকাড়া, প্রায় দুই কেজি পর্যন্ত।

বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, এই কাঠবিড়ালির শরীরের গঠন ও বর্ণ একে অন্য প্রজাতির চেয়ে আলাদা করেছে। এর মাথা, পিঠ, কান এবং দীর্ঘ লেজ সাধারণত গাঢ় কালো বা লালচে-মেরুন বর্ণের হয়। তবে শরীরের নিচের অংশটি বেশ হালকা বা সাদাটে। বিশাল আকৃতি ও লম্বা লেজ নিয়ে যখন এটি উঁচু গাছের মগডালে বিচরণ করে, তখন দূর থেকেও একে সহজে চেনা যায়।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল মূলত গহিন ও প্রাচীন বনের ওপর নির্ভরশীল। এরা সাধারণত মাটিতে নামে না বললেই চলে; বরং বড় বড় গাছের মগডালে ও ডালপালায় সময় কাটাতে পছন্দ করে। উঁচু গাছে লতাপাতা ও ডাল দিয়ে এরা বড় আকৃতির বাসা তৈরি করে। বুনো ফল, নানা রকম বীজ, বাদাম ও গাছের কচি পাতা এদের প্রধান খাবার। তবে বর্তমানে বন উজাড়, পুরোনো বৃক্ষ নিধন ও মানুষের অনুপ্রবেশের কারণে এদের আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসছে। রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, এই অভয়ারণ্যে মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের উপস্থিতি আমাদের বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি খবর। এটি প্রমাণ করে যে, এই বনটি এখনো বিরল বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয় মানুষেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দেব মনে করেন, গহিন বন ও প্রাচীন বৃক্ষ রক্ষা করা না গেলে এই প্রজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, জায়ান্ট স্কুইরেল পুরোপুরি বৃক্ষনির্ভর প্রাণী। বড় ও পুরোনো গাছ কমে গেলে এদের খাদ্য ও নিরাপদ আবাসের সংকট তৈরি হয়। তাই রেমা-কালেঙ্গার প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে বড় গাছগুলো সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, রেমা-কালেঙ্গায় এই বিরল প্রজাতির দেখা পাওয়া আনন্দের। তবে শুধু দেখা পাওয়াটাই যথেষ্ট নয়, এদের টিকিয়ে রাখা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। অবৈধ শিকার বন্ধ এবং বনের গহিনে মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভবিষ্যতে এই প্রজাতির সংখ্যা আরও বাড়বে। বনকে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ রাখতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বর্তমানে আলোকচিত্রীর তোলা সেই বিশালাকৃতির কাঠবিড়ালির ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ সাড়া ফেলেছে।

প্রকৃতিপ্রেমীরা মনে করছেন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি নজরদারি বাড়লে রেমা-কালেঙ্গা হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিরল বন্যপ্রাণী দেখার অন্যতম গন্তব্য।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.