নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সিলেটে বিএনপির আভ্যন্তরীন বিরোধ আবার প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনেকদিন ধরেই অর্ন্তদ্বন্দ্ব চলে আসছে। তবে রাষ্ট্রপতির সফরে এসে এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
মঙ্গলবার সিলেট সফরে আসেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওইদিন সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এই নাগরিক সংবর্ধনা ঘোষণা দিয়ে বর্জন করে সিলেট মহানগর বিএনপি। এছাড়া বিএনপির আরও কয়েকজন নেতা এই অনুষ্ঠানে যাননি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, একক সিদ্ধান্তে সংবর্ধনা আয়োজন ও অন্য নেতাদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ এনেছেন বর্জনকারী নেতারা। তবে বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই বর্জনের নেপথ্যেও রয়েছে সিটি করপোরেশন নির্বাচন।
জানা যায়, ২২ ফেব্রুয়ারি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সিসিকের প্রশাসকের দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি সিলেট বিএনপির অনেক নেতা। বিশেষত মহানগর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করা বিএনপি নেতারা এতে মনক্ষুন্ন হন। জেলা বিএনপির সভাপতিকে সিসিকের দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টি তারা ইতিবাচকভাবে নেননি। এরমধ্যে কাইয়ুম চৌধুরী আগামী সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া বিএনপির মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী অপর বিএনপি নেতাদের সাথে আরও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যা রাষ্ট্রপতির সফরে প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
মঙ্গলবারের সফরে সিলেটের দুই ওলির মাজার জিয়ারত ছাড়া সিলেট সিটি কর্পোরেশনের দেওয়ার সংবর্ধনা সভায় যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসক হচ্ছেন জেলা বিএনপির সভাপতি কাইয়ুম চৌধুরী। আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক তিনি। এতো দিন বিএনপির হয়ে এই পদে লড়েছেন বর্তমান শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। আওয়ামী লীগ আমলেও তিনি দুই মেয়াদে মেয়র নির্বাচন হন। এবার তিনি মেয়র পদে মাঠে থাকার সম্ভাবনা না থাকায় স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা। তবে রাষ্ট্রপতির সফরে সেই স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে অপ্রীতিকর পরিবেশ।
বিএনপি মহাসচিব থেকে সদ্য রাষ্ট্রপতি হওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট সফর নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখালেও মঙ্গলবার তার সম্মানে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দেয় সিলেট মহানগর বিএনপি। এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সিলেট সিটি করপোরেশন। নগরভবনে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির কোন নেতা অংশ নেননি।
সংবর্ধনা বর্জকারী নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য হাদিয়া চৌধুরী মুন্নী, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও ওয়াসার চেয়ারম্যান মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী প্রমুখ। এদের মধ্যে অন্তত ৪ জন সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী।
এ প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়া নিয়ে জেলা ও মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ কারণেও সিটি করপোরেশনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপির কয়েকজন নেতা যাননি।
যা বলছেন বর্জনকারী নেতারা
রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে না যাওয়া প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, সিসিক প্রশাসক যেভাবে নাগরিক কমিটি গঠনের কথা বলেছিলেন, তা না করে খামখেয়ালিভাবে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্নভাবে আমাদের অপদস্থ করা হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী সিলেটে এলে আমাদের গাড়ি শাহজালাল (রহ.) মাজার ও শাহী ঈদগাহ এলাকায় প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিল। এবার সেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। এমনকি শাহজালাল মাজারেও আমাদের গাড়ি প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এসব সার্বিক কারণেই আমরা নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বয়কট করেছি।
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, গত দেড় দশকের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা নির্যাতিত, নিপীড়িত, কারাবরণ ও অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাননি। দুঃসময়ে এসব নেতাকর্মীর পাশে দাঁড়ানো একজন রাজপথের কর্মী হিসেবে আমি এটিকে আমার মানবিক দায়িত্ব মনে করেছি। সে কারণেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে না যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার বিবেক আমাকে বাধা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, রাষ্ট্রপতির নাগরিক সংবর্ধনার জন্য বিভিন্ন সমন্বয় সভায় নাগরিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সিলেট সিটি করপোরেশনর প্রশাসক (আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী) নাগরিক কমিটি গঠন না করে তিনি একক সিদ্ধান্তে সিসিক প্রাঙ্গণে সংবর্ধনা প্রদান করেন। তিনি (সিসিক প্রশাসক) পরিকল্পিতভাবে আমাদের সকল কর্মসূচীর বাইরে রাখতে চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, সিসিক প্রশাসক কোনদিন মহাপনগরে রাজনীতি করেননি। মহানগরের নেতাকর্মীদেরও তিনি চিনেন না। তাই আমরা তাকে সহযোগীতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি উল্টো পরিকল্পিতভাবে আমাদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন।
যা বললেন কাইয়ুম চৌধুরী
এ প্রসঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বুধবার সিলেটটুডেকে বলেন, রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা কেউ বর্জন করেছেন বলে আমার জানা নেই। আমরা ১২শ’ লোককে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। আমন্ত্রিতদের প্রায় সকলেই এসেছেন। এর মধ্যে ২/৪ জন নানা কারণেই বাদ পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি কোন রাজনৈতিক দলের নয়, তিনি কোন রাজনৈতিক ব্যত্ত্বিত্ব দেন। রাষ্ট্রপতি সবার, তিনি রাষ্ট্রের প্রধান। উনার সংবর্ধনায় কেউ না এলে এটা তার ব্যাপার।
সিসিক প্রশাসক বলেন, রাষ্ট্রপতি আমাকে ডেকে নিয়ে অরাজনৈতিকভাবে সংবর্ধনা আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছি। আমি তার নির্দেশ অনুসারে কাজ করেছি। অরাজনৈতিকভাবে এ সংবর্ধনার আয়োজন করেছি। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে দাওয়াত করেছি। আর এই আয়োজনে আমি সভাপতিত্ব করেছি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে, বিএনপির সভাপতি হিসেবে নয়। এতে কে কোন কারণে আসেননি তা আমার জানা নেই।
কাইয়ূম চৌধুরী আরও বলেন, তবে আমাদের আয়োজনে রাষ্ট্রপতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি আমিসহ সিসিকের সবাইকে ধন্যবাদ দিয়েছেন।
সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের প্রার্থী হওয়া নিয়ে দলীয় বিরোধের কারণে এমনটি ঘটেছে কী না- এই প্রশ্নের জবাবে কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আমার জানা নেই। তবে এরকম হওয়ার কথা নয়। কারণ রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা দলীয় কোন অনুষ্ঠান নয়। এখানে রাজনীতির সম্পৃক্ততা নেই।
তবে প্রধানমন্ত্রী যখন আমাকে প্রশাসকের দায়িত্ব প্রধান করেন তখনই মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন। আমি তার নির্দেশ অনুসারে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, যুক্ত করেন সিলেট জেলা বিএনপির এই সভাপতি।