কুলাউড়া প্রতিনিধি | ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সবুজে মোড়া লংলা চা-বাগান। ভোরের কুয়াশা ভেজা পাতা কুড়ানোর গন্ধ, আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা নির্মল স্বপ্ন। সেই স্বপ্নই আজ পাখা মেলেছে সুদূর ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে।
নাম তার চম্পা নাইডু। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগানের এক শ্রমজীবী পরিবারের মেয়ে। যার কারেণে আজ চা-বাগানের গল্পটাও বদলে যাচ্ছে।
সময় ২০১০ সাল। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য খুলে দেওয়া ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেন ছোট্ট চম্পা। বিনা খরচে পড়া, বিনা খরচে থাকা। সেখান থেকেই শুরু।
তারপর সময় এগিয়ে যেতে থাকলো। চম্পা নাইডু ক্যামেলিয়া ডানকান হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ২০১৫ সালে এসএসসি পাস করলেন। অতঃপর ভর্তি হলেন কুলাউড়ার স্বনামধন্য মহিলা বিদ্যাপীঠ ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রি কলেজে। সেখান থেকেও কৃতিত্বের সাথে ২০১৭ সালে এইচএসি পাস করলেন। এ যেন মেধার আলোয় ভাসিয়ে দিলেন চা-বাগানের অন্ধকার ক্ষেত্রগুলো। স্বীকৃতি হিশেবে পেলেন ডাচ্-বাংলা ফাউন্ডেশনের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণামূলক বৃত্তি।
তারপর পা রাখলেন শাহজাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায়। সেখানে বুনতে শুরু করলেন আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। শুরু করলেন নব উদ্যমে বিদ্যালাভ। তবে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ছুটে যেতেন নিজের শেকড়ের কাছে। কাজ করতেন স্বজাতি চা-শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়, শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিতের সংকল্পে।
সেই সংকল্প থেকে শেকড়ই হলো তার গবেষণার বিষয়।
চম্পা খুব কাছ থেকে দেখেছেন—চা-বাগানের মানুষের ঘাম, চোখের জল আর অধিকারের আকুতি। তাই ঠিক করলেন, এই মানুষগুলোর জন্যই কিছু করতে হবে। সেই থেকে লক্ষ্যের দিকে তার অদম্য ছুটে চলা। কিন্তু পথটা মসৃণ ছিল না মোটেই। ছিল হাজারো প্রতিকূলতা।
ঠিক তখনই পেয়ে গেলেন ভারত সরকারের ICCR স্কলারশিপ। সময় ২০২৩ সাল। চম্পা পাড়ি জমালেন ভারতে। ভর্তি হলেন অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন অন্ধ্র? কারণ ওই মাটিতেই মিশে আছে তার পূর্বপুরুষের শেকড়, তেলুগু রক্তের টান।
২০২৫ সাল। আবার ICCR স্কলারশিপ। এবার পিএইচডি। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার ফিরিয়ে দিয়েছেন—শুধু শেকড়ের টানে।
এখন তার গবেষণার টেবিলে বাংলাদেশের চা-শ্রমিক। ২০২৫ থেকে ২০২৮। এই ৩ বছর চম্পার কলমে উঠে আসবে বাংলাদেশের চা-বাগানের মানুষের জীবন, মানবাধিকার আর সামাজিক বাস্তবতার কথা।
চম্পার ভাষ্য, আমি অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামী ধারায় শুধু সমস্যা খোঁজছি না। খুঁজছি সমাধানের পথ। কীভাবে নীতিমালা বদলালে চা-শ্রমিকের জীবনমান বাড়বে, কীভাবে মর্যাদা ফিরবে, আর সেকারণেই আমার গবেষণার কোর থিম হচ্ছে 'পাবলিক পলিসি ও হিউম্যান রাইটস'।
এদিকে চম্পার জয়কে নিজেদের জয় ভাবছেন লংলা চা-বাগানের ছোট্ট মেয়েরা। তারাও আজ উচ্ছ্বসিত মনে জানিয়ে দিচ্ছেন, চম্পা দিদির মতো একদিন আমরাও পারব।
চম্পা প্রমাণ করে দিয়েছেন—চা-বাগানে জন্ম নিলেই জীবন থেমে থাকে না। ইচ্ছা থাকলে চায়ের পাতা থেকেও পিএইচডির ডিগ্রি ওঠে।
তিনি চা-বাগান ছেড়ে আসেননি। বরং চা-বাগানকে সাথে নিয়েই বিশ্ব দরবারে হাজির হচ্ছেন।