মৌলভীবাজার প্রতিনিধি | ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমানকে একদিনের মধ্যে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেট-৪ আসনের এমপি আরিফুল হক মৌলভীবাজার জেলার উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলার সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মৌলভীবাজারের আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয়বিষয়ক মতবিনিময় সভায় সিভিল সার্জনকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমানের বিরুদ্থে দায়িত্বে অবহেলা, প্রশাসনিক গাফিলতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে রোববার মৌলভীবাজারে আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সমন্বয় সভা চলাকালে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি ফোনে কথা বলেন এবং অনিয়মে অভিযুক্ত সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
মন্ত্রীর ফোনের পরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেয় এবং এক কার্যদিবসের মধ্যে উক্ত সিভিল সার্জনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা প্রদান করে।
স্থানীয় ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ডা. মামুনুর রহমান জেলায় সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদানের পর থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগে তীব্র স্থবিরতা দেখা দেয়। জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চরম চিকিৎসক সংকট, বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ বিতরণে অনিয়ম, বৈষম্য ও সাধারণ রোগীদের হয়রানির অভিযোগ উঠতে থাকে। চিকিৎসাসেবার মান ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হলে সুশীল সমাজ ও স্থানীয়রা এ বিষয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে অবহিত করেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রীর ফোন পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জরুরি পর্যালোচনা শেষে তাকে প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা পদায়নের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এ বিষয়ে দু-এক দিনের মধ্যেই অর্থ ও স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
সভায় মন্ত্রী বলেন, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়ম সহ্য করবে না। সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমানকে সোমবারের মধ্যে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেলের সভাপতিত্বে সভায় আরিফুল হক চৌধুরী আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সমন্বয় ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে গৃহীত সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। সকলের সমন্বিত উদ্যোগপ মৌলভীবাজারকে মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
মন্ত্রী বলেন, সভায় উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। জেলা পর্যায়ের পর পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করে স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হবে।
তিনি বলেন, তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ আরও গতিশীল হবে। মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সরেজমিনে পরিদর্শনের কথাও জানান মন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, মৌলভীবাজারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাদের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনগুলো জানতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক যোগাযোগ ও অন্যান্য মৌলিক অবকাঠামোর উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রবাসে কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে তরুণদের বিদেশি ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রী বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা পর্যায়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাদকবিরোধী কার্যক্রমে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্য থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার কথা জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, আগামী এক মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে অগ্রগতি যাচাই করা হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মৌলভীবাজারকে একটি মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সভায় সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ ও মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব নুমেরী জামান ও উপসচিব মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম, জেলা পরিষদ সদস্য মো. মিজানুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহবায়ক ফজলুল করিম ময়ূন ও সদস্য সচিব আবদুর রহিম রিপনসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।