Sylhet Today 24 PRINT

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পরও বদলায়নি ওসমানী হাসপাতালের চিত্র, ময়লা-দুর্গন্ধে ভোগান্তি

বাপ্পা মৈত্র |  ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চলতি মাসের শুরুতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে সাত দিনের মধ্যে হাসপাতালের সব সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফরের একমাস পেরোতে চললেও এখন পর্যন্ত কোন কিছুরই পরিবর্তন হয়নি। হাসপাতালেল পরিবেশ কিংবা সেবার মানের তেমন কোনো উন্নতিই হয়নি। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতায় ‘দৃশ্যমান পরিবর্তনের’ কথা দাবি করছে।

পরিচ্ছন্নতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে কি-না, তা দেখতে রোববার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরে পরিচ্ছন্নতার চিত্রে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। জরুরি বিভাগ দিয়ে ঢোকার পর নিচতলার বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক-পলিথিন ও পানের পিক পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিঁড়ির বিভিন্ন কোনেও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পানের পিক।

হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার হৃদরোগ ওর্য়াডে রোগীদের ভিড় দেখা গেছে। এ ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতেও বেড পেতে রোগীদের রাখা হয়েছে। বাথরুমে দুর্গন্ধ। মেঝেতে জমে থাকা পানির সঙ্গে জুতার ধুলোবালি মিশে পিচ্ছিল হয়ে তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

বাথরুমের পাশেই বেডে এবং মেঝেতেও রোগী ও স্বজনরা অবস্থান করছেন। দুর্গন্ধের কারণে তারা নাকমুখ চেপে থাকছেন। এ সময় দুপুরের খাবার দিতে দেখা যায় দায়িত্বরত এক ব্যক্তিকে; খাবারে ভাত, মাঝারি এক টুকরো মুরগি ও সবজি দেওয়া হয়।


হৃদরোগ ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজন বলেন, “বাথরুমের গন্ধের কারণে হাসপাতালে টেকা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় থাকলে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ হতে দেরি হবে। নিচে থাকা রোগীদের পাশ দিয়ে বাথরুমে যেতে হয়, কখন কখনও মেঝেতে থাকা রোগীর বেডে পা লাগে অনেকের।”

১১ নম্বর ওর্য়াডের পুরুষ সার্জারি বিভাগে রোগীর চাপ অন্য ওর্য়াডের চেয়ে কম চোখে পড়েছে। তবে ওর্য়াডের মেঝে ও বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে। বাথরুম থেকে দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে।

এ বিভাগে বড় ভাইকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন এক ব্যক্তি। তার ভাইয়ের অপারেশন হয়েছে।

তিনি বলেন, “সকালে ডাক্তার দেখে গেলে পরে প্রয়োজন পড়লে ডাক্তার ও নার্সদের বললে তারা আসেন। কোনো সময় একটু দেরিতে আসেন, কোনো সময় সঙ্গে সঙ্গে চলে আসনে। উনাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে আরকি।’’

১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনি বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে। দ্বিতীয় তলার লেবার ওটির বারান্দায় সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুকে নিয়ে বসে আছেন স্বজনরা। তাদের আশপাশেও পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। একই ভবনে থাকা চিকিৎসকদের ক্যান্টিনের চারপাশের মেঝেতেও ময়লা, পানের পিক ও প্লাস্টিকের কাপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

হাসপাতালের নতুন ভবনের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন তলায় রোগীরা দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে চিকিৎসক দেখাচ্ছেন। তবে চিকিৎসা সেবা চালু থাকলেও ভবনজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে চরম অবহেলা ও নোংরা পরিবেশ।

ভবনটির তৃতীয় তলায় চর্ম-যৌন ও মানসিক বিভাগের ব্যালকনি সংলগ্ন টিনের ছাউনিতে জমে আছে ময়লার বিশাল স্তূপ। অন্যদিকে, একই ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগে গিয়ে দেখা যায় বাথরুমগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও জরাজীর্ণ অবস্থা।

চারপাশ ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকার পাশাপাশি বাথরুমের ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, যা চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

নতুন ভবনের লিফটে ওঠার জন্য রোগী-স্বজনদের জটলার মধ্যে রোগীদের জন্য খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় খাবার বিতরণের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তিকে।

চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রোগীদের সরবরাহ করা খাবারের মান ও পরিবেশন পদ্ধতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

নতুন ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগের এক রোগী বলেন, “দুপুরের খাবারে ভাত, এক টুকরো মুরগি আর এক হাতা সবজি দেওয়া হয়। তবে পরিচ্ছন্নতা না মেনে তারা মুরগি ও সবজি একসঙ্গেই ঢেলে দেয়; আলাদা করে দিতে চাইলে দিতে চায় না।”

রোবাবর দুপুরের দিকে সরাসরি সাক্ষাৎকালে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) ডা. আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, “পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। ডাক্তারাও ঠিক সময়ে হাসপাতালে আসেন। সকাল সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে, তারপর ডাক্তারা ওর্যাডে যান।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নির্দেশের পর হাসপাতালের জলবল ও যন্ত্রপাতির চাহিদা পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এছাড়াও নতুন ক্যানসার বিল্ডিং চালু করার জলবল চাহিদা পাঠানো হয়েছে।’

তবে হাসপাতালের এই অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের পেছনে জনবল সংকটকে দায়ী করছেন এ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ‘‘বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২৬২ জন কর্মচারী দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। তবে এই হাসপাতালে এ কাজের জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ জন লোক দরকার।”

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, “হৃদরোগ ওর্যাডে রোগী থাকার কথা ৪০ জন, বর্তমানে আছেন ১২০ জন। রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পরও কিছুক্ষণ পরই আবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েক বার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় হাসপাতাল।’’

তিনি বলেন, “৯০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও জনবল রয়েছে ৫০০ শয্যার জন্য। অথচ প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বাথরুমের দরজা-জানালা সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.