Sylhet Today 24 PRINT

লবণের অস্থিমজ্জা: কবিতার নতুন অভিজ্ঞান

আবিদ ফায়সালের নতুন কাব্যগ্রন্থের পাঠ-উন্মোচন

সিলেটটুডে ডেস্ক |  ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

কবি দিলওয়ারের বিখ্যাত পঙক্তি 'পৃথিবী স্বদেশ যার আমি তার সঙ্গী চিরদিন।’ কবির কাছে পৃথিবী যেন এক অখণ্ড স্বদেশ; সীমান্তের রেখা সেখানে খুব বেশি অর্থ বহন করে না। সেই বিশ্বনাগরিক চেতনারই এক সমকালীন প্রতিফলন দেখা যায় কবি আবিদ ফায়সালের কবিতায়। কানাডায় বসবাস করলেও তাঁর কাব্যচিন্তায় স্বদেশ, মাটি, মানুষ ও শেকড়ের উপস্থিতি গভীর ও অনিবার্য। বিশ্বকে তিনি দেখেন বিস্তৃত এক মানবভূমি হিসেবে, কিন্তু সেই দৃষ্টির কেন্দ্রে বারবার ফিরে আসে তাঁর নিজস্ব দেশ ও মাতৃভূমি।

অভ্র প্রকাশন থেকে প্রকাশিত কবি আবিদ ফায়সালের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘লবণের অস্থিমজ্জা’-এর পাঠ-উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তাদের আলোচনায় উঠে আসে তাঁর কবিতার এই স্বাতন্ত্র্য। কবিতায় নান্দনিকতার নতুন বিভা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন অর্থ, নতুন প্রতীক ও নতুন অভিজ্ঞতার অনুসন্ধানই যে তাঁর কাব্যভাবনার প্রধান বৈশিষ্ট্য—বক্তারা সে কথাই তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশ বলেন, সৎ কবিরা অভিধানের দাসত্ব করেন না; তাঁরা নতুন অভিধান নির্মাণ করেন, নতুন অর্থ নির্মাণ করেন। তাঁর মতে, এই নির্মাণের কাজে আবিদ ফায়সাল অনেকটাই সিদ্ধকাম হয়েছেন। পাঠকের প্রতিক্রিয়া ও সামগ্রিক মূল্যায়নেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।

তিনি বলেন, আবিদ ফায়সালের কবিতার নির্মাণশৈলী ও প্রকাশভঙ্গিতে নান্দনিকতার একটি স্বতন্ত্র আভা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দক্ষতার সঙ্গে মিথের ব্যবহার করেছেন। মিথ তাঁর কবিতায় শুধু অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; বরং তা কবিতার ভাবনা, ইতিহাস ও মানব-অভিজ্ঞতার গভীরে প্রবেশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

কবি ও গবেষক মোস্তাক আহমাদ দীন নৃপেন্দ্রলাল দাশের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন, আবিদ ফায়সালের কবিতায় নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা রয়েছে। তাঁর মতে, প্রবাসজীবন কবিকে নিজের স্বদেশকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার একটি বিশেষ সুযোগ করে দিয়েছে। দূরত্ব কখনও কখনও শেকড়কে মুছে দেয় না; বরং আরও স্পষ্ট করে তোলে। আবিদ ফায়সালের কবিতায় সেই দূরত্বের ভেতর দিয়ে স্বদেশকে নতুন করে আবিষ্কারের প্রয়াস লক্ষ করা যায়।

লেখক ও রবীন্দ্র গবেষক মিহির কান্তি চৌধুরী বলেন, একটি বইকে শুধু তার প্রচ্ছদ দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়—এ কথা যেমন সত্য, তেমনই একটি বইয়ের নামও কখনও কখনও পাঠকের মনে একটি বিশেষ কৌতূহল ও ভাবনার দরজা খুলে দেয়। ‘লবণের অস্থিমজ্জা’ নামটি তাঁকে গভীর কিছু প্রতীকের দিকে নিয়ে যায়।

শিরোনামের মধ্যেই তিনি রক্ত, অস্থি, স্মৃতি ও মানুষের আদিম অস্তিত্বের নানা অনুষঙ্গ খুঁজে পান। তাঁর মতে, এই নামের ভেতরেই কবির ভাবনার একটি গভীর ও রহস্যময় ইঙ্গিত নিহিত রয়েছে।

কবি ফজলুর রহমান বাবুল বলেন, ‘লবণের অস্থিমজ্জা’য় কবির ব্যক্তিস্মৃতি ধীরে ধীরে মহাজাগতিক স্মৃতিতে মিশে গেছে; আর ব্যক্তিগত ক্ষুধা হয়ে উঠেছে মানুষের আদিম ক্ষুধার প্রতীক।

তিনি বলেন, এই কাব্যগ্রন্থ কখনও পাঠককে লোককথার অন্ধকারে নিয়ে যায়, কখনও প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর দিকে, আবার কখনও মানুষের ক্ষুধা, নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্বের গভীরে পৌঁছে দেয়। শেষ পর্যন্ত মনে হয়, এই বিপুল কল্পলোকের অন্তঃসলিলে কবি আসলে খুঁজে চলেছেন মানুষের সেই আদিম লবণ—যা শরীরেরও আগে, ভাষারও আগে, পৃথিবীর প্রথম নিশ্বাসের সঙ্গে মিশে ছিল।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি ও গবেষক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অপূর্ব শর্মার সঞ্চলানায় সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রবাসজীবন রূঢ় বাস্তবতার জীবন। এই জীবনের পরতে পরতে রয়েছে সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের মধ্যেই এখন রত কবি আবিদ ফায়সাল। তাঁর পঠন-পাঠন এবং বিশেষত মিথ, বিশ্ব-ইতিহাস, নৃতত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিরন্তর চর্চা প্রশংসার দাবি রাখে।

ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, পরাবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে জীবনকে কীভাবে যাপন করা যায়, ‘লবণের অস্থিমজ্জা’য় তারই একটি ভাষ্য উপস্থাপিত হয়েছে। নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা যে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরন্তর সংগ্রামের বিষয়, কবি তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর কবিতার শব্দ, পঙক্তি ও প্রতীকের ভেতর দিয়ে সেই অস্তিত্ব-সংগ্রাম, একাকিত্ব, স্মৃতি ও মানুষের আদিম সত্তাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি ও প্রকাশক মালেকুল হক, কবি ও লেখক ওয়াহিদ রোকন এবং কবি ও জিন্দাবাজার সম্পাদক জাহেদ আলী।

সব মিলিয়ে ‘লবণের অস্থিমজ্জা’ কেবল একজন প্রবাসী কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির কাব্য নয়; এটি স্বদেশ ও প্রবাস, ব্যক্তিস্মৃতি ও মহাজাগতিক স্মৃতি, মিথ ও ইতিহাস, ক্ষুধা ও অস্তিত্বের এক আন্তঃসম্পর্কিত কাব্যভুবন। আবিদ ফায়সালের কবিতা সেই ভুবনে দাঁড়িয়ে নতুন ভাষা, নতুন প্রতীক ও নতুন অর্থের সন্ধান করেন—যেখানে দূর কানাডা থেকেও কবির চোখ বারবার ফিরে আসে তার শেকড়ের দিকে, আর শেকড় থেকে বিস্তৃত হয় সমগ্র পৃথিবীর দিকে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.