Sylhet Today 24 PRINT

মাঝপথেই আটকে আছে ‘তারবিহীন সিলেট নগর’ গড়ার উদ্যোগ

দীপ্ত বৈষ্ণব |  ১১ অক্টোবর, ২০২৬

২০২০ সালে দেশে প্রথম বারের মতো সিলেট নগরের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রম চালু হয় সিলেটে। তার আগে সড়িয়ে ফেলা হয় সড়কের ওপরে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের জঞ্জাল। যা দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়।

পর্যায়ক্রমে নগরজুড়ে সম্প্রসারিত হবে এ উদ্যোগ, এমনটিই জানানো হয়েছিল সে সময়। বলঅ হয়েছিল, গড়ে তোলা হবে ‘তারবিহীন সিলেট নগর’। তবে ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এই উদ্যোগ আর তেমন এগোয়নি। দরগাহ গেইট থেক সার্কিট হাউস পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার সড়কে মাটির নীচ দিয়ে বিদ্যুৎতের তার টানা হলেও, এই সড়কের উপরে বিদ্যুতের খুঁটি ও তার এখনও রয়ে গেছে।

জানা যায়, সিলেট নগরের বিদ্যুতের খুঁটি ও তারের জঞ্জাল কমিয়ে শহরের সৌন্দর্য বাড়ানোর এমন লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালনের পরীক্ষামূলক পাইলট প্রকল্প। ২০১৯ সালে কাজ শুরু হওয়া এ উদ্যোগের আওতায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায় সাত কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ভূগর্ভস্থ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

তবে নগরের দরগাহ গেইট সড়ক ছাড়া অন্যসব এলাকায় এখনো বিদ্যুতের খুঁটি ও তার দৃশ্যমান। তবে এই প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিস্ট নানা দপ্তরে ঘুরেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে কয়েক দিন চেষ্টা করেও সিলেটের বিদ্যুৎ বিভাগ ও সিলেট সিটি করপোরেশনের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে ‘সিলেট বিভাগ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সে প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায় সাত কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ভূগর্ভস্থ করার জন্য ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানা গেছে বিভিন্ন গনমাধ্যে উল্লেখিত তথ্যে। দরগাহ গেট থেকে নয়াসড়ক, কুমারপাড়া, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজারের কোর্ট পয়েন্ট, সার্কিট হাউস হয়ে তালতলা এবং চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়ক হয়ে নবাব রোড পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার ছিল।

প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে শুরু হয়, দীর্ঘ সাত বছর পর চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন, ব্যয় ও সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

তথ্য নেই কারো কাছে

এই প্রকল্পের ব্যাপারে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী জারজিসু রহমান রনির বলেন, “এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন বিদায়ী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান। তিনি প্রকল্পে ছিলেন। টানা পাঁচ বছর এ প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এ ব্যাপারে জাহিদুর রহমান জানান, প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। এ বিষয়ে জানতে নুরুল হুদা চৌধুরী ও সাইদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তাঁর ভাষ্য, নুরুল হুদা চৌধুরী প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি অবসরে যাওয়ার পর সাইদুর রহমান দায়িত্ব দেখেছেন।

পরে সাইদুর রহমানের সাথে যোগাযো করা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধর ভালো বলতে পারবেন। তবে তাঁর জানা অনুযায়ী বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ মোটামুটি শেষ হয়েছে।’

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিদ্যুতের তার দৃশ্যমান থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, দরগাহ গেইট থেকে সার্কিট হাউস পর্যন্ত সাত কিলোমিটার সড়কের দুই পাশেই আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন রয়েছে। তবে মাঝখানে একটি ওভারহেড লাইন রাখা হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে সমস্যা হলে গ্রাহকেরা তাৎক্ষণিক বিকল্প সংযোগ পেতে পারেন।

ভূগর্ভস্থ লাইনে কখনো সমস্যা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি জানান, অনেক আগে জিন্দাবাজারে একবার তারে লিকেজ হয়েছিল। পরে তা মেরামত করা হয়েছে।

সাইদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, আম্বরখানা থেকে সার্কিট হাউস এবং জিন্দাবাজার থেকে নয়াসড়ক হয়ে পানসি রেস্টুরেন্ট ও মির্জাজাঙ্গাল পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। তবে তালতলা এলাকায় কাজ হয়নি বলে জানান তিনি। মেডিকেল রোডে কিছু কাজ হয়েছে বলেও তাঁর মনে পড়ে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি প্রকল্প পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, মির্জাজাঙ্গাল বিদ্যুৎ অভিযোগ কেন্দ্রের লাইনম্যান আব্দুল কাইয়ুমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশপাশের অধিকাংশ এলাকায় এখনো প্রচলিত ওভারহেড লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালন হচ্ছে।

এ ব্যপারে সিলেট সিটি করপোরেশনে যোগাযোগের পর গত মাসে প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, এটি অনেক আগের প্রকল্প। এ বিষয়ে আমার তেমন জানা নেই। আমার আগে আরিফুল হক চৌধুরী ও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী কাজ করেছেন পরে ইন্টেরিম সরকারের সময় গেছে। আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন সিটি করপোরেশনের নির্বাহী বিদ্যুৎ প্রকৌশলী।

পরে সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ প্রকৌশলী জয়দেব বিশ্বাস বলেন, তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী পিডিবিকে দরগাহ গেট থেকে মেডিকেল রোড হয়ে নবাব রোড এবং নয়াসড়ক, কুমারপাড়া হয়ে তালতলা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ভূগর্ভস্থ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে দরগাহ ও জিন্দাবাজারের কিছু এলাকায় কাজ হয়েছে। ওই সময়ে সড়কে থাকা ইন্টারনেট লাইন, আইএসপি এবং অন্যান্য ইউটিলিটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে সিটি করপোরেশন সহযোগিতা করেছে। তবে বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করেছে পিডিবি, তাদের তত্ত্বাবধান ও অর্থায়নে।

বাকি কাজ কেন সম্পন্ন হয়নি, সে বিষয়ে তিনি বলেন, এটা পিডিবি বলতে পারবে। সিলেট পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হাসান এ প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।


পিডিবির সহকারী প্রকৌশলী জিয়াউল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি জৈন্তাপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে আবাসিক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্পে তিনি মূলত দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। বিস্তারিত জানতে প্রকল্প পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

জিয়াউল হাসান বলেন, কুমারপাড়া ও নয়াসড়ক হয়ে সার্কিট হাউস পর্যন্ত প্রায় সব এলাকার কাজ হয়েছে। তবে গ্রাহকদের সুবিধার্থে কিছু কিছু এলাকায় ওভারহেড লাইন রাখা হয়েছে।

আর প্রকল্পের পরিচালক চন্দন কুমার সূত্রধর জানান, ২০২৩ সালের নভেম্বরের দিকে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র থাকাকালীন সময়ে তিনি প্রকল্পের দায়িত্ব বুঝে নেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০১৬ সালের দিকে অনুমোদিত হলেও কাজ শুরু হয় ২০১৮-১৯ সালের দিকে। প্রকল্পের সব কাজ শেষে চলতি বছরের জুনে এটি সমাপ্ত হয়েছে।

চন্দন কুমার সূত্রধর আরও বলেন, ‘এই প্রকল্পের আওতায় ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি অংশ ছিল। সেই কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তবে পুরো শহরকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়নি। যতটুকু করার কথা ছিল, ঠিক ততটুকুই করা হয়েছে।’

পুরো নগরকে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিষয়টি এমন নয় যে পুরো শহরকে এ প্রকল্পের আওতায় আনার কথা ছিল। আগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এবং প্রকল্পের নথিতে যতটুকু জেনেছি, তৎকালীন মেয়র ও বর্তমান শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মূলত পুরো শহরকে তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে ব্যয়বহুল ও জটিল হওয়ায় মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পরিকল্পনা পর্যায়ে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.