নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমদ (৩৪) হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ বৃহস্পতিবার। হত্যাকান্ডের প্রায় ৬ বছর পর ঘোষিত হতে চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার রায়। যদিও এ মামলার ৬ আসামির মধ্যে ৫ জনই পলাতক রয়েছে।
এরমধ্যে রায়হান হত্যা মামলার প্রধান আসামি তৎকালীন ইনচার্জ পুলিশের বহিস্কৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁঞার গ্রেপ্তার ও পলায়ন দুটোই আজও রহস্য। রায়হান পরপরই ভারতে ভারতে পালিয়ে যান বা পালানোর চেষ্টা করেন আকবর। সেসময় ভারত লাগোয়া কানাইঘাটের ডোনা সীমান্ত থেকে তাকে আটকের কথা জানায় পুলিশ। আর গত বছরে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে তিনি ফের ভারতে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রায়হানের পরিবারের।
২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতের দিকে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। পরদিন ১১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রায়হানের স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করলে তদন্তে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া যায়। ঘটনার পরপরই এসআই আকবরসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।
২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পিবিআই। অভিযোগপত্রে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। অন্য অভিযুক্তরা হলেন এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাস, ফাঁড়ির ‘টু-আইসি’ পদে থাকা এসআই হাসান উদ্দিন ও আকবরের আত্মীয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান।
যেভাবে গ্রেপ্তার
২০২০ সালের ৯ নভেশ্বর আকবর হোসেন ভূঁঞাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেসময় পুলিশ জানিয়েছিল, কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী ডোনা এলাকা থেকে তাঁকে জেলা পুলিশের একটি দল গ্রেপ্তার করে।
তবে সীমান্ত এলাকার অন্য একটি সূত্র জানায়, আকবর কানাইঘাটের ডোনা সীমান্তের ওপারে খাসিয়া পল্লিতে বসবাস করছিলেন। খাসিয়ারা কৌশল করে তাঁকে বাংলাদেশে পাঠালে পুলিশ খবর পেয়ে গ্রেপ্তার করে।
ডোনা সীমান্তের দুজন প্রত্যক্ষদর্শী সেসময় বলেছিলেন, গ্রেপ্তারের সময় আকবর আগ বাড়িয়ে পুলিশকে নিজের পরিচয় দেন। এ সময় তাঁর বেশভূষা অনেকটা খাসিয়া পল্লিতে বসবাসকারীদের মতো ছিল। গলায় পুঁতির মালাও দেখা যায়।
সিলেট নগরীর আখালিয়া নিহারিপাড়ার বাসিন্দা রায়হানকে ১০ অক্টোবর রাতে সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরের দিন ১১ অক্টোবর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলার পর মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি তদন্ত করে নির্যাতন করার সত্যতা পায়। ১২ অক্টোবর ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেন ভূঁঞাসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। ১৩ অক্টোবর আকবর পুলিশি হেফাজত থেকে পালিয়ে গা-ঢাকা দেন আকবর।
পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় মামলাটির তদন্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর ন্যস্ত হলে ১৯ অক্টোবর ফাঁড়ির সেন্ট্রি পোস্টে কর্তব্যরত তিনজন কনস্টেবল আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে রায়হানকে নির্যাতনের বর্ণনা ও নির্যাতনকরীদের নাম বলেন। রায়হানকে নির্যাতনের মূল হোতা ছিলেন এসআই আকবর।
যেভাবে পালিয়ে যান
গত বছরের আগস্টে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান আকবর। এরপর ১১ আগস্ট সিলেট কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি।
এরপর ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ পিটিশন ফর লিভ টু আপিল দায়ের করে। শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ উচ্চ আদালতের আদেশ স্থগিত করেন। পাশাপাশি আকবর হোসেনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতে আর আত্মসমর্পন করেননি আকবর।
রায়হানের মা সালমা বেগমের অভিযোগ, আকবর হোসেন ভূঁইয়া জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরই ভারতে পালিয়ে গেছেন।
জানা যায়, ১২ আগস্ট রাত সাড়ে আটটার দিকে এসআই আকবর আখাউড়া সীমান্ত হয়ে ভারত পালিয়ে যান। এ জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আবুল ফজল চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মঙ্গলবার তাঁর জামিন স্থগিত হয়েছে। তাঁকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আত্মসমর্পণ না করলে তাঁকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করবেন।