Sylhet Today 24 PRINT

সুনামগঞ্জে যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষীর বাড়িতে হামলা-লুটপাট, ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি |  ০২ নভেম্বর, ২০২৬

ফাইল ছবি

সুনামগঞ্জের শাল্লায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার এক সাক্ষীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ৩৩ জনের নাম এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য।

রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে ভুক্তভোগীর মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা শাল্লা থানায় মামলাটি করেন।

হামলায় প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে, গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে শাল্লা উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করেন। এ সময় ছয়টি গরু, পাঁচটি ফ্রিজ, দুটি আইপিএস, দুটি ব্যাটারি, একটি এলইডি টেলিভিশন, সাড়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থসহ প্রায় ৪০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

চুরির অভিযোগের পর হামলার দাবি

দুলাল মিয়ার মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলার ভাষ্য, গত ২৩ অক্টোবর তাদের দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। এরপর তারা বিষয়টি পুলিশকে জানান। গত ২৯ অক্টোবর পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করতে তাদের বাড়িতে যায়। পুলিশ চলে যাওয়ার পর গ্রামে পুলিশ আসার কারণ নিয়ে কয়েকজন ক্ষুব্ধ হন। পরে রাত ৯টার দিকে গ্রামের জালাল মিয়া, আবদুল হেকিম ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ অনেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে বাড়িতে হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন তিনি।

উজ্জ্বলার ভাষ্য, হামলাকারীরা বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি মালামাল লুট করেন এবং পরিবারের নারী-পুরুষদের মারধর করেন।

হামলায় দুলাল মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কুলসুমা বেগম (৩২), মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা (৩৫), ছোট ছেলে উজ্জ্বল মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৩২) এবং উজ্জ্বল মিয়ার ছেলে এলিম মিয়া (৩) আহত হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে কুলসুমা বেগম দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং অন্যরা শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী দুলাল

দুলাল মিয়া ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার সাক্ষী। তার বাবা মামুদ মিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের হাতে শহীদ হন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। তার ফুফু প্রয়াত জমিলা খাতুনও বীরাঙ্গনা ছিলেন।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় শাল্লা উপজেলার উজানগাঁও, শ্যামারচর ও পেরুয়া গ্রামে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন পেরুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাস। ওই মামলায় জুবায়ের মুনির, জাকির হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান, দৌলতপুর গ্রামের আবদুল হেকিম, আবদুল গণি মিয়া ও তোতা মিয়াসহ ১১ জন গ্রেপ্তার হন। দুলাল মিয়া ওই মামলার সাক্ষী।

দুলাল মিয়ার অভিযোগ, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সাক্ষী হওয়ায় তাদের পরিবারের ওপর আগে থেকেই ক্ষোভ রয়েছে একটি পক্ষের। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তারা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

দুলাল মিয়া জানান, তার মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা ও মেয়ের জামাই হেলাল মিয়া বাড়িতে থাকেন। তারা বাড়ির সামনে একটি দোকান দিয়ে ব্যবসা করেন। হামলাকারীরা দোকান ও বাড়ির মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মাদক কারবার নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলেছেন অভিযুক্ত জালাল মিয়া। তিনি বলেন, উজ্জ্বলার পরিবার এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে পরিচিত। এলাকার মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের বারবার এ ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু তারা তা করেননি বলে দাবি করেন তিনি।

মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১০ বাড়িতে হামলা-লুটপাট
জালাল মিয়া বলেন, ‘আমরা উজ্জ্বলার বাড়িঘর লুটপাটের সঙ্গে জড়িত নই। এলাকার লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করতে পারে।’

অন্যদিকে, সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা জানান, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করেন এবং এর আগে অন্তত ১২ জনকে মাদকসহ পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। তার দাবি, ওই ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ এখন তাদের হয়রানি ও হুমকি দিচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে এবং গত কয়েক বছরে তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও চুরিসহ ২০ থেকে ২৫টি মামলা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল বলেন, দৌলতপুর গ্রামে উজ্জ্বলার বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে রোববার বিকেলে মামলা হয়েছে। মামলায় ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ [email protected] ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.