শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি | ০৭ নভেম্বর, ২০২৬
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পাহাড়ি ছড়া, নদী ও কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন যেন থামছেই না। প্রশাসনের একের পর এক অভিযান, জরিমানা, কারাদণ্ড ও মামলা সত্ত্বেও বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বালু উত্তোলনকারী চক্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান চালিয়ে বালু জব্দ করা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই আগের মতো শুরু হয় উত্তোলন। এতে সরকার হারাচ্ছে সম্ভাব্য রাজস্ব, আর প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে কৃষিজমি, গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও বসতবাড়ি।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, উপজেলায় থাকা ২৮টি বালুর কোয়ারি ও মহালের মধ্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র দুটি সাধারণ বালুমহাল। বাকি ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি ইজারার বাইরে থাকলেও সেগুলো ঘিরে অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আইনে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ১ লাখ ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়া পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জব্দ করা বালু নিলামে বিক্রি করে রাজস্ব আয় হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ২৫০ টাকা। এর সঙ্গে ৩১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বরের আরও দুটি অভিযান যুক্ত হওয়ায় ২ নভেম্বর পর্যন্ত অভিযানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮টিতে। তবে এত অভিযানেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি।
সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর পৃথক দুটি অভিযান চালিয়ে উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ২৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২ নভেম্বর বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত মির্জাপুর ইউনিয়নের মুড়াছড়া ও বৌলাছড়া ভাঙা পুলসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। এর আগে ৩১ অক্টোবর একই ইউনিয়নের রায়পরান পশ্চিমপাড়া মসজিদসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। দুটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম। জব্দ করা বালু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম বলেন, অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত কাউকে পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ড দেওয়া সম্ভব হয়নি। জব্দ করা বালু আইন ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জনস্বার্থে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এর আগে সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ ও কালাপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ভেকু মেশিন ও অন্যান্য সরঞ্জাম জব্দ এবং ধ্বংস করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন ছড়া ও নদী থেকে আবার বালু উত্তোলন শুরু হয়।
অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা ও সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ির চাপায় অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত টমটমের চালকসহ ছয়জন আহত হন। এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করা হলে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা। এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরাও হামলার শিকার হন।
এদিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় মামলাও হয়েছে। চলতি বছরের ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে পরিবেশের ক্ষতি করার অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমিসংলগ্ন এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এসব ছড়ার মধ্যে রয়েছে বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া ও খাইছড়াসহ আরও কয়েকটি ছড়া।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সদর, সিন্দুরখান, আশিদ্রোন, সাতগাঁও, ভূনবীর, মির্জাপুর ও কালাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ছড়া থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল সদর, কালিঘাট ও রাজঘাট ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানেও ছোট পরিসরে বালু তোলা হচ্ছে।
পরিবেশকর্মী তাপস দাশ বলেন, পাহাড়ি ছড়া থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে তীরভাঙন, কৃষিজমির ক্ষয়, সড়ক ও সেতুর ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বসতবাড়ি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে মোট ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি ও দুটি সাধারণ বালুমহাল রয়েছে। সাধারণ বালুমহাল দুটি হলো গোপলা ছড়া ও শিয়াল ছড়া। এই দুটি বালুমহাল ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে বাকি ২৬টি সিলিকা বালুর কোয়ারি দীর্ঘদিন ধরে ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন প্রতিরোধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষিজমি সুরক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কেউ আইন অমান্য করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।